জাতীয়

ঢাকায় সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে লটারি চালুর উদ্যোগ: আইনমন্ত্রী

ঢাকায় সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে লটারি চালুর উদ্যোগ: আইনমন্ত্রী

পোস্টিংয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ; দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় ‘প্রশ্নবোধক ডিপার্টমেন্ট’, ঢাকায় পোস্টিংয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সাংবাদিক জিএম রফিককে হেনস্তার ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দাবি

বিশেষ প্রতিবেদক

সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন বন্ধে ঢাকায় প্রথমবারের মতো লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়কে দেশের অন্যতম ‘প্রশ্নবোধক ডিপার্টমেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, বিশেষ করে ঢাকায় পোস্টিং পেতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে।

রোববার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। কিছু সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়ন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় প্রথমবারের মতো লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তার মতে, এ পদ্ধতি চালু হলে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়ম এবং আর্থিক লেনদেনের সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে যেসব সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারব্যবস্থা সংস্কারের কাজ চলছে। এ প্রক্রিয়ায় সময় লাগবে উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্টদের সরকারের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান।

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, তারা অর্থনৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন না; তবে তাদের বিরুদ্ধে তিনি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি’র অভিযোগ তোলেন। এর ফলে দেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও নির্বাচনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের বিচারব্যবস্থার সমালোচনা করে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে।’ তিনি জানান, বর্তমান সরকার সেই ব্যবস্থা মেরামতের কাজ করছে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জোর

সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা—এ কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। অতীতে নির্যাতনের শিকার হলেও প্রতিশোধের রাজনীতিতে না যাওয়ার নীতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারের নীতিও প্রতিশোধপরায়ণ না হওয়া।

বাক্‌স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার মানুষের মতপ্রকাশ, কথা বলা এবং বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। তবে একই সঙ্গে হলুদ সাংবাদিকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের চরিত্র হননের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের দাবিও বিভিন্ন মহল থেকে আসছে বলে জানান তিনি।

সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ সংশোধনের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আইনটি যথেষ্ট নয় মনে হওয়ায় সংশোধনের জন্য মন্ত্রিসভায় একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। মানুষের বাক্‌স্বাধীনতার সঙ্গে বিষয়টি সম্পৃক্ত থাকায় প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবটি আরও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি সাব-কমিটিতে পাঠান। পরে সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে জনপরামর্শের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার এসব কর্মকাণ্ড দমনে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে যেমন অভিযান ও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধেও নজর দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক নেতা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিজ এলাকার একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে আইনমন্ত্রী জানান, ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতা এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করছিলেন। তিনি প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। পরে প্রশাসনের পদক্ষেপে ওই নেতাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার কোনো ধরনের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে প্রশ্রয় দিতে চায় না।

সাংবাদিক জিএম রফিককে হেনস্তার ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ

এদিকে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় ও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক প্রভাতী খবরের প্রধান প্রতিবেদক জিএম রফিক হেনস্তার শিকার হওয়ার ঘটনায় সাংবাদিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান করতে গেলে সাংবাদিক জিএম রফিককে হেনস্তা করা হয়। এ ঘটনায় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন।

ঘটনার পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক ও পেশাজীবী মহলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সাংবাদিকের ওপর হামলা, হেনস্তা বা দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

জিএম রফিককে হেনস্তার ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকাস্থ খুলনা বিভাগীয় সাংবাদিক ফোরাম, বাংলাদেশ সাংবাদিক কমিউনিটি, শহীদ জিয়া পরিবেশ শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি সংবাদকর্মীদের বিভিন্ন মহল।

সাংবাদিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধান এবং তথ্য সংগ্রহ করা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্বের অংশ। দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিককে হেনস্তা বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।

এদিকে আইনমন্ত্রীর সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি চালুর ঘোষণা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বক্তব্যকে সংশ্লিষ্ট মহল ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। তাদের প্রত্যাশা, বদলি-পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রেজিস্ট্রেশন বিভাগের অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালনির্ভরতার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।