বিশ্ব

ব্রিকস: পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মাঝেও সমঝোতার রূপরেখা

ব্রিকস: পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মাঝেও সমঝোতার রূপরেখা

ইরান-আমিরাত বিরোধে মে মাসের বৈঠকে হয়নি যৌথ বিবৃতি, দিল্লি সম্মেলনে শেষ পর্যন্ত ঐকমত্য
নিজস্ব প্রতিবেদক:
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত ও সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্যের মধ্যেও যৌথ ঘোষণার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে ব্রিকস। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিরা একই টেবিলে বসেছেন। তবে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জোটের অভ্যন্তরীণ বিভক্তিও এ সম্মেলনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। দুই দেশের এই বিরোধের প্রভাব পড়ে ব্রিকসের কার্যক্রমেও। মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জোটটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে রয়টার্সকে দেওয়া চারটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের শীর্ষ সম্মেলনে আয়োজক ও মধ্যস্থতাকারীরা একটি যৌথ ঘোষণার খসড়ায় ঐকমত্যে পৌঁছান। প্রস্তাবিত ঘোষণায় কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে একতরফা সামরিক হামলার নিন্দা জানানো হয়। পরে ব্রিকস নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে খসড়াটি অনুমোদন করেন।
সম্প্রসারণে বেড়েছে মতপার্থক্য
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত ব্রিকসে ২০২৪ সালে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যোগ দেয়। এরপর ২০২৫ সালে সদস্য হয় ইন্দোনেশিয়া।
সদস্যসংখ্যা বাড়ায় জোটের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরিধি বিস্তৃত হলেও পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সদস্য দেশগুলোর অবস্থানের পার্থক্যও বেড়েছে। ফলে কোনো বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে।
ব্রিকসের কাছে ইরানের প্রত্যাশা
শুক্রবার ব্রিকস বিজনেস ফোরামে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানান।
কোনো দেশ যেন অন্য দেশের ‘বৈধ বাণিজ্যে’ বাধা সৃষ্টি করতে না পারে—এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।
এদিকে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো, দ্রুত লেনদেনের ব্যবস্থা সংযুক্ত করে ‘ব্রিকস পে’ চালু এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল মুদ্রার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মতো উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা চলছে।
বিরোধের মধ্যেও সহযোগিতা
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে মতবিরোধ থাকলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইরান ও আমিরাতের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। শুক্রবারের ফোরামে ব্রিকস অর্থনীতিতে নারী উদ্যোক্তাদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং নতুন বাজার সুবিধা সম্প্রসারণের যৌথ উদ্যোগে দুই দেশের প্রতিনিধিরা সমর্থন জানান।
ভারতের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা
ব্রিকসের বর্তমান সম্মেলনের আয়োজক ভারতও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে আরব দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক কর্মরত।
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিসংলগ্ন এলাকায় নৌযানে হামলায় ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনাও নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শুক্রবার ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মুক্ত নৌচলাচল ও নাবিকদের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে ভারত আরব দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌযানে ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একই সময়ে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতার বিষয়ে একটি নথিতেও স্বাক্ষর করেছে।
ব্রিকসে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়া ও চীন ব্রিকসকে পশ্চিমা প্রভাবের বিপরীতে বৈশ্বিক ভারসাম্য তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতে চায়। অন্যদিকে ভারত ও ব্রাজিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার সংস্কারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবু এসব মতপার্থক্যের মধ্যেও যৌথ ঘোষণায় পৌঁছানো ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ সমঝোতার সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।