সাহিত্য

আবুল মনসুর আহমদ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: রোচনা মজুমদারের নতুন বই নিয়ে ভাবনার নতুন দিগন্ত

আবুল মনসুর আহমদ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: রোচনা মজুমদারের নতুন বই নিয়ে ভাবনার নতুন দিগন্ত

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আবুল মনসুর আহমদের ভাবনা

তৈমুর রেজার মতে, রোচনা মজুমদারের এই বইটি দুটি প্রধান কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

১. আন্তর্জাতিক ধারার প্রভাব: আবুল মনসুর আহমদকে এতদিন শুধু আঞ্চলিক বা ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা হলেও, রোচনা মজুমদার দেখিয়েছেন কীভাবে তিনি সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ২. আমেরিকান জাতীয়তাবাদের অনুপ্রেরণা: আঠারো ও উনিশ শতকে ব্রিটেনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য ভাঙতে আমেরিকা যেভাবে নোয়া ওয়েবস্টার বা জন টুকের চিন্তায় নিজস্ব ‘আমেরিকান ইংরেজি’ ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব (Cultural Sovereignty) গড়ে তুলেছিল, আবুল মনসুর আহমদ সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। তিনি ব্রিটেনের অভিজাত ইংরেজির বিপরীতে যেমন আমেরিকান অ্যাংলো-স্যাক্সন ভাষার লড়াই দেখেছিলেন, তেমনি প্রচলিত অভিজাত ‘মিনার-বাংলা’র বিপরীতে সাধারণ মানুষের ‘খামার-বাংলা’কে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা বনাম কৃষ্টিক স্বকীয়তা

বইটির একটি অন্যতম মূল থিসিস হলো—কেবল রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব লাভই (১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালে) জাতি হিসেবে বাঙালি মুসলমানের পূর্ণতার জন্য যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি নিজস্ব ‘কৃষ্টিক স্বকীয়তা’ অর্জন করা জরুরি।

বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব জীবনের ভাষা ও সংস্কৃতির সংকট বহুকাল ধরেই ছিল। ১৮৭৩ সালের মৌলবি নইমুদ্দীনের ‘জোব্দা তোল্ মাছায়েল্’ থেকে শুরু করে মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্য কিংবা আবুল মনসুর আহমদের নিজস্ব রচনার অভিজ্ঞতা—সবখানেই দেখা গেছে প্রচলিত অভিজাত বাংলা লিখতে গিয়ে সাধারণ মুসলিম জীবনের ব্যবহৃত শব্দ বাদ পড়ে যেতো। আবুল মনসুর এই স্বকীয় অভিজ্ঞতা ও ভাষাকে ভিত্তি করেই পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

বর্তমান বাংলাদেশ ও নতুন সাংস্কৃতিক কল্পনা

১৯৫০-৬০ এর দশকে ভারতীয় বা পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ভয়ে আবুল মনসুর আহমদ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য গ্রহণ নিয়ে সন্দিগ্ধ ছিলেন। তবে আজকের বাস্তবতায় বিশাল পরিবর্তন এসেছে:

  • বাংলা সংস্কৃতির কেন্দ্র বাংলাদেশ: বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সংস্কৃতি কোণঠাসা হয়ে পড়লেও স্বাধীন বাংলাদেশই এখন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

  • আধিপত্যবাদের অবসান: সেই সময়ের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের চাপ এখন বিলীনপ্রায়। তাই রবীন্দ্রনাথসহ সামগ্রিক বাঙালি সংস্কৃতিকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

তৈমুর রেজা তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, আবুল মনসুর আহমদ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে একজন বস্তুনিষ্ঠ চিন্তক হিসেবে তিনি এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন খেয়াল করতেন। তিনি রবীন্দ্রনাথসহ সামগ্রিক সাহিত্য ঐতিহ্যকে বাংলাদেশের সম্পদ হিসেবে দাবি করে একটি নতুন জাতীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব দিতেন।

বই পরিচিতি:

বই: আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা

লেখক: রোচনা মজুমদার

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন

পৃষ্ঠা: ৭২ | মূল্য: ২০০ টাকা