সাহিত্য

সৃজন পাঠচক্রে আহমেদ বাসারের কাব্য ও রেজাউল করিম রনির সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

সৃজন পাঠচক্রে আহমেদ বাসারের কাব্য ও রেজাউল করিম রনির সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

সম্প্রতি বাংলা একাডেমির আল মাহমুদ লেখক কর্নারে শিল্প, সাহিত্য ও সমাজ-চিন্তার পত্রিকা ‘সৃজন’-এর উদ্যোগে একটি বিশেষ পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আয়োজনে প্রধানত দুটি ভিন্নধর্মী কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়, যার প্রথম পর্বে ছিল কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসারের নবপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘সাড়া দাও প্রাচীন পাথর’-এর পাঠ-পর্যালোচনা এবং দ্বিতীয় পর্বে ছিল লেখক ও তাত্ত্বিক রেজাউল করিম রনির ‘বৈষম্যের ধারণা’ শীর্ষক একক বক্তৃতা। দেশের স্বনামধন্য কবি, লেখক ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি সমসাময়িক সাহিত্য ও সমাজতাত্ত্বিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্মে পরিণত হয়। আহমেদ বাসারের ১৫টি গ্রন্থের মধ্যে সৃজন থেকে ২০২৬ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি মূলত ৬২টি কবিতার সমন্বয়ে গঠিত, যা বিভ্রম পাহাড়, আগুননদীর শিরদাঁড়া ও সাড়া দাও প্রাচীন পাথর—এই তিনটি স্বতন্ত্র অংশে বিভক্ত হয়ে জীবন, জগৎ, প্রতিবাদ ও প্রণয়ের তৃষ্ণাকে তুলে ধরেছে।

আয়োজনের প্রথম পর্বে আলোচক ও গবেষক অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল হক এবং কথাসাহিত্যিক সালেহা ফেরদৌস কাব্যগ্রন্থটির নির্মাণশৈলী, অন্তমিল ও ভাষাভঙ্গির প্রশংসা করে এর নান্দনিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করেন। কবি আহমেদ বাসার তার সাহিত্যচর্চার দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, তিনি যতিচিহ্নহীন কাব্যশৈলী বেছে নিয়েছেন কারণ তার মতে, যতিচিহ্ন ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও জীবনকে বাধা দিতে পারে না। কবি তার এই কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে জীবনের নতুন কোনো তাৎপর্য এবং অধরা জীবনের ভাষাভঙ্গি নির্মাণের প্রচেষ্টাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণকারী কবি ও আবৃত্তিশিল্পীরা বইটির বিভিন্ন কবিতা পাঠের মাধ্যমে এর গভীরতা ও আবেগীয় আবেদন তুলে ধরেন, যা উপস্থিত শ্রোতাদের মাঝে এক প্রাণবন্ত সাহিত্যিক আবহ তৈরি করে।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে তাত্ত্বিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রেজাউল করিম রনি সমাজ থেকে কৃত্রিম বৈষম্য দূরীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে একটি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা উপস্থাপন করেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সমাজে বিদ্যমান প্রাকৃতিক বৈষম্য পরিহারযোগ্য নয়, কিন্তু মানুষসৃষ্ট বা কৃত্রিম বৈষম্য দূর করা সম্ভব ডিকমোডিফিকেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তার মতে, যদি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও মৌলিক চাহিদার সমতা নিশ্চিত করা যায়, তবে শ্রেণিবৈষম্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। তিনি একজন ব্যারিস্টার এবং একজন রিকশাচালকের জন্য একই ধরনের চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদাহরণ টেনে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার তাত্ত্বিক কাঠামো তুলে ধরেন, যা উপস্থিত সুধিমহলের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে।

সামগ্রিকভাবে এই পাঠচক্রটি সাহিত্যিক আলোচনার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য নিরসনের প্রয়োজনীয়তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমন্ডলে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। আহমেদ বাসারের কাব্যিক নিরীক্ষা এবং রেজাউল করিম রনির সমাজতাত্ত্বিক প্রস্তাবনা একই মঞ্চে উপস্থাপিত হওয়ায় এটি কেবল একটি সাধারণ পাঠচক্রের সীমাবদ্ধতায় থাকেনি, বরং একটি চিন্তাশীল ও কার্যকর সংলাপে রূপ নিয়েছে। যতিচিহ্নহীন কবিতার মাধ্যমে জীবনকে সংজ্ঞায়িত করা এবং কৃত্রিম বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের এই বার্তা ভবিষ্যতে দেশের সাহিত্যিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন চিন্তার খোরাক জোগাবে বলে আশা করা যায়।