জাপানি বহুজাতিক কোম্পানি টয়োটা তুশো করপোরেশনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল গত ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারপ্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে। করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইচিরো কাশিতানির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের কোনো একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেইকেল বা এইচইভি উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলা, যা ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মূলত বাংলাদেশে শিল্পায়নের প্রসার, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে এই বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নিশ্চিত করেছে যে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপনের পথে রয়েছে।
গাড়ি উৎপাদনের পাশাপাশি টয়োটা তাদের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ককে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে, যা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য টয়োটার সেবা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়াকে আরও সহজলভ্য করে তুলবে। ভুক্তভোগী বা সাধারণ ব্যবহারকারীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, আমদানিকৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং কারিগরি সেবার উচ্চমূল্য ও দুষ্প্রাপ্যতা তাদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে ফেলে। স্থানীয়ভাবে কারখানা স্থাপিত হলে এই যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা বাড়বে এবং সামগ্রিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া টয়োটা তাদের ‘বাংলাদেশের সঙ্গে, বাংলাদেশের জন্য’ দর্শনকে সামনে রেখে তরুণ প্রজন্মের জন্য কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি দেশের অটোমোবাইল সেক্টরে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ঘাটতি পূরণে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা স্থানীয় মেধা ও শ্রমশক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের শিল্প প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করবে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে টয়োটার এই বিনিয়োগ প্রস্তাবকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন, যারা এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিশেষ করে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানেও টয়োটা তুশো করপোরেশনকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করা হবে, যাতে প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়িত হতে পারে।
এই বিনিয়োগ প্রকল্পটি কেবল একটি গাড়ি উৎপাদন কারখানার সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। অটোমোবাইল শিল্পের এই উত্তরণ দেশীয় শিল্প খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তি স্থানান্তরের পথ প্রশস্ত করবে। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে তা একদিকে যেমন আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করবে, অন্যদিকে দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য তৈরি করবে কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ। পরিশেষে, টয়োটার মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের এই উপস্থিতি বাংলাদেশের শিল্প মানচিত্রকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের গাড়ির পরিচিতি তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।