বাণিজ্য

৩০টি ব্যাংকের কার্ড ও এটিএম সেবা সচল: আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসির সিস্টেম মাইগ্রেশন জটিলতার অবসান

৩০টি ব্যাংকের কার্ড ও এটিএম সেবা সচল: আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসির সিস্টেম মাইগ্রেশন জটিলতার অবসান

দেশের আর্থিক খাতের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার পর অবশেষে স্বাভাবিক হয়েছে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের কার্যক্রম। গত ৪ অক্টোবর রোববার রাত ৯টা থেকে সিস্টেম মাইগ্রেশনের অজুহাতে দেশের ৩০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এটিএম, পিওএস, ই-কমার্স এবং এনপিএসবিসহ কার্ডভিত্তিক সব ধরনের লেনদেন সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসি (আইটিসি) পরিচালিত এই নেটওয়ার্কের আকস্মিক বন্ধের ফলে গ্রাহকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। দীর্ঘ প্রায় ৪৮ ঘণ্টা অচল থাকার পর ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার রাতে আইটিসি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে সেবা পুনরায় চালু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। ব্যাংক এশিয়াসহ বিভিন্ন ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের খুদে বার্তার মাধ্যমে লেনদেন শুরুর তথ্য অবহিত করলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। মূলত সিস্টেম স্থানান্তরের নামে গ্রাহক স্বার্থকে উপেক্ষা করে এই দীর্ঘ সময় সেবা বন্ধ রাখা ছিল একটি বড় ধরনের পেশাদারিত্বের ঘাটতি, যা পুরো ব্যাংকিং খাতের অনলাইন লেনদেন ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

সিস্টেম মাইগ্রেশনের নামে এই আকস্মিক সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রাহকদের জন্য তীব্র ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ গ্রাহকরা যখন জরুরি প্রয়োজনে এটিএম বুথ বা কার্ডভিত্তিক কেনাকাটায় ব্যর্থ হন, তখন ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টার আগে এই সেবা সচল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই দীর্ঘস্থায়ী সময়সীমা গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে এবং দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনে স্থবিরতা সৃষ্টি করে। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ ছিল, কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি বা বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই নেটওয়ার্ক বন্ধ করায় তারা তাদের নিজস্ব অর্থ উত্তোলন বা ব্যবহার করতে পারছিলেন না। ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার ওপর নির্ভরশীলতা যখন বাড়ছে, তখন কিউ-ক্যাশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্কের দায়সারা মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া গ্রাহকদের অধিকারকে মারাত্মকভাবে খর্ব করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। প্রতিটি লেনদেন পয়েন্টে যখন গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হয়েছেন, তখন ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট বিকল্প সমাধান না দেওয়া ছিল তাদের চরম ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিউ-ক্যাশের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে তলব করে দ্রুত সেবা সচল করার কঠোর নির্দেশনা প্রদান করে। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয় যে, গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং লেনদেনের স্বাভাবিকতা বজায় রাখা ব্যাংকগুলোর আইনি দায়িত্ব। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই জরুরি তলব এবং নজরদারির পরেই আইটিসি কর্তৃপক্ষ তাদের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ ত্বরান্বিত করতে বাধ্য হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অবস্থানের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কিউ-ক্যাশের সব সেবা পুনরায় সচল হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে যে, কারিগরি সক্ষমতা থাকার পরও সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং তদারকির অভাবে সাধারণ গ্রাহকদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো এবং আইটিসি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতা যে এই সংকটের মূল কারণ ছিল, তা এখন পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং অবকাঠামোর ভঙ্গুরতাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ বা সিস্টেম আপগ্রেডেশনের নামে গ্রাহককে জিম্মি করে রাখার সংস্কৃতি আর্থিক খাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি কেবল গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট করে না, বরং দেশের ক্যাশলেস ইকোনমি বা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যমাত্রাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। ভবিষ্যতে এ ধরনের বড় ধরনের সিস্টেম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিকল্প বা ব্যাকআপ সার্ভার নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে অবহিত করা অপরিহার্য। আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর এই গাফিলতি থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে ভবিষ্যতে ডিজিটাল লেনদেন সেবার ওপর আরও কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ গ্রাহককে আর কখনো এমন আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে না হয়।