রাজনীতি

আ.লীগের সিগারেট কোম্পানি পরিচালনা করছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী: রাশেদ খাঁন

আ.লীগের সিগারেট কোম্পানি পরিচালনা করছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী: রাশেদ খাঁন

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন গত ৬ অক্টোবর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন, যেখানে তিনি দাবি করেন যে আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র আবদুস সবুর লিটনের মালিকানাধীন সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান 'তারা ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো'র নাম পরিবর্তন করে 'জেনুইন লিফ টোব্যাকো লিমিটেড' রাখা হয়েছে। রাশেদ খাঁনের অভিযোগ অনুযায়ী, এই নাম পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তদন্ত থেকে কোম্পানিটিকে আড়াল করা। এই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে থেকে বর্তমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কোম্পানিটি পরিচালনা করছেন বলে দাবি করা হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী এ কে এম জিয়া উদ্দিনকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বসানো হয় এবং পরবর্তীতে তাকে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের পদ প্রদান করা হয়, যা পুরো ঘটনার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ভুক্তভোগী মহল এবং সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক আদর্শের দোহাই দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে এভাবে পুরনো সুবিধাভোগীদের শেল্টার দেওয়া জনস্বার্থের পরিপন্থী। রাশেদ খাঁনের ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের এই ধরনের ব্যবসায়িক সুরক্ষা প্রদান করা এনসিপির নতুন রাজনৈতিক কৌশল কি না, তা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে তুষার ভূঁইয়া ও প্রাডো গাড়ি কাণ্ডের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে তিনি ইঙ্গিত করেছেন যে, কুষ্টিয়ার ঘটনার পর থেকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দলীয় নেতারা দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঘটনাটি একটি বড় ধরনের নৈতিক স্খলন হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ যে দলের জন্মই হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, সেই দলের নেতাদের বিরুদ্ধেই এখন আওয়ামী সুবিধাভোগীদের অর্থ জোগানদাতা হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, রাজস্ব ফাঁকির মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত প্রতিষ্ঠানকে আড়াল করতে রাজনৈতিক পদ ব্যবহার করা কেবল আইনের লঙ্ঘনই নয়, বরং জনগণের আস্থার সাথেও এক ধরনের প্রতারণা।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহলে এবং এনসিপির অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে তোলপাড় শুরু হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত দলটির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা তদন্তের ঘোষণা পাওয়া যায়নি। রাশেদ খাঁন সরাসরি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের দিকে আঙুল তুলে জানতে চেয়েছেন, এই সিগারেট কোম্পানি থেকে উপার্জিত অর্থের ভাগ কি দলীয় উচ্চপদস্থদের পকেটে যাচ্ছে, নাকি তারা কেবল নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এই কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করছেন। এনবিআর-এর তদন্তাধীন একটি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় টিকিয়ে রাখার এই অপচেষ্টা প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সমালোচকরা মনে করছেন, যদি এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে এটি এনসিপির রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ফেলবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দলের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। সরকারি সংস্থাগুলোকে পাশ কাটিয়ে এভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়া প্রশাসনের বর্তমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের সাথে সাংঘর্ষিক।

পরিবহন ও শিল্পখাতের মতো সংবেদনশীল খাতের এই ধরনের বিতর্কিত লেনদেন ভবিষ্যতে দেশের রাজস্ব কাঠামো এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যখন দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করার জন্য রাজস্ব আদায় বাড়ানো জরুরি, তখন এই ধরনের হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির সাথে জড়িতদের শেল্টার দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাশেদ খাঁনের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে এনসিপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে, বিষয়টি কেবল দলীয় কোন্দল নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অবিলম্বে এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই জেনুইন লিফ টোব্যাকো লিমিটেডের আড়ালে থাকা সকল প্রভাবশালী ও নেপথ্যের কুশীলবদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনবে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ে অপরাধীকে সুরক্ষা দেওয়ার এই সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করবে।