নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে বেতন নির্ধারণের নিয়মে অসংগতি, গ্রেডের ক্রম জটিলতা এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাবের কারণে বেতন বাড়লেও উল্টো মোট আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আইবাস++ এ জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে অনেকের বর্ধিত বেতন পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে বিভিন্ন অসংগতি ও জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর তাদের চার মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে আইবাস++ (iBAS++) পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ না হওয়ায় এবং নানা নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়ে অনেক কর্মচারী নির্ধারিত সময়ে নতুন বেতন না পেয়ে আপাতত পুরোনো কাঠামোতেই বেতন পাওয়ার আশঙ্কায় আছেন।
গ্রেড নিচে, কিন্তু বেতন বেশি হওয়ার আশঙ্কা
নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন ও কর্মচারীদের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্রেডভিত্তিক বেতনের স্বাভাবিক ক্রমে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে।
-
উদাহরণস্বরূপ, নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫,০০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪,৩০০ টাকা (এখানে ১১তম গ্রেড এগিয়ে ৭০০ টাকা)।
-
কিন্তু পুরোনো বেতন সমন্বয়ের পর দেখা যাচ্ছে, ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭,০০০ টাকা, আর ১২তম গ্রেডের একজনের হচ্ছে ৩৭,৭০০ টাকা।
এর ফলে প্রারম্ভিক বেতনে এগিয়ে থাকা ১১তম গ্রেডের কর্মচারী বেতন নির্ধারণের পর ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে ৭০০ টাকা কম পাচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে সুযোগ কার্যকর হলেও এই ব্যবধান রয়ে যাচ্ছে।
পদোন্নতির পরও আয় হ্রাসের শঙ্কা
নতুন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। কর্মচারীদের হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা ১০ বছর চাকরি পূর্ণ করার পর নবম গ্রেডে পদোন্নতি বা প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেলে তার মূল বেতন ১,৩০০ টাকা বাড়লেও— গ্রেড পরিবর্তনের কারণে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে যায়।
-
উদাহরণস্বরূপ, ৪৯,৭০0 টাকা মূল বেতনের ওপর ৫০% হারে বাড়িভাড়া হয় ২৪,৮৫০ টাকা।
-
কিন্তু নবম গ্রেডে ৫১,০০০ টাকা মূল বেতনের ওপর ৪৫% হারে বাড়িভাড়া হয় ২২,৯৫০ টাকা।
এতে মূল বেতন ১,৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া কমছে ১,৯০০ টাকা। ফলে সামগ্রিকভাবে মাসিক আয় ৬০০ টাকা পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম নিয়ে জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মচারীদের মধ্যেও বেতন সমান হয়ে যাওয়ার জটিলতা তৈরি হয়েছে।
আইবাস++ এর জটিলতা ও সমাধানহীনতা
সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ‘আইবাস++’-এ বেতন নির্ধারণের কাজ করতে গিয়ে অভিজ্ঞ জনবলের ঘাটতি ও নতুনদের অনভিজ্ঞতার কারণে অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজ এখনো শেষ হয়নি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি এবং ৫ অক্টোবর থেকে কাজ শুরু হলেও অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগসহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে জটিলতা কাটেনি।
অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে এ বিষয়ে আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত সুরাহা মেলেনি। অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, প্রজ্ঞাপন তৈরিতে সংশ্লিষ্টদের জানাশোনার ঘাটতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তা নিরসনে কাজ চলছে।
তবে ১ নভেম্বরের আগে এসব অসংগতি দূর না হলে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বর্ধিত বেতনের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।




