ইয়েমেনের রাজধানী সানার উপকণ্ঠে অবস্থিত বানি হুশাইশ এলাকায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ভয়াবহ বিমান হামলায় ৩৩ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩৯ জন। হুতি-পরিচালিত সাবা বার্তা সংস্থার তথ্যমতে, সানার পূর্বে অবস্থিত হুথি নিয়ন্ত্রিত এই জনবহুল এলাকাটি লক্ষ্য করে একের পর এক বিমান হামলা চালানো হয়। গত জুলাই মাসে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ভেঙে পুনরায় লড়াই শুরু হওয়ার পর এটিই অন্যতম প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গভীর রাতে চালানো এই অতর্কিত হামলায় সাধারণ মানুষের বাড়িঘর ধূলিসাৎ হয়ে যায়, যার ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নারী ও শিশুসহ বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাটি ইয়েমেনের চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাসে নতুন এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যেখানে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
ঘটনার ভয়াবহতা আরও বৃদ্ধি পায় যখন উদ্ধারকাজ পরিচালনার সময় দ্বিতীয় দফায় বিমান হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সেহাতুনা হাসপাতালের পরিচালক আব্দুল-আজিজ আল-দাইলামি জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছানোর পরপরই আবারও বিমান হামলা চালানো হলে বহু উদ্ধারকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মী হতাহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলার পরপরই পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং চারদিকে আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেকে আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যাদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা সময়ের সাথে সাথে ক্ষীণ হয়ে আসছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া গুরুতর আহত রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো, যেখানে পর্যাপ্ত ওষুধ ও সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, কোনো ধরনের সতর্কতা ছাড়াই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই হামলা চালানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন।
এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে এই হামলাকে পরিকল্পিত গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে সৌদি জোটের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো দায় স্বীকার করা না হলেও, তারা ইয়েমেনের বিভিন্ন স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে এই সামরিক অভিযান পরিচালনার ইঙ্গিত দিয়েছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি জুলাই মাসে ভেঙে যাওয়ার পর থেকে রিয়াদ ও হুথিদের মধ্যে সংঘাতের মাত্রা তীব্রতর হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ ও তেহরানের ছায়া যুদ্ধের বলি হচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অবিলম্বে এই সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানালেও, কোনো পক্ষই নমনীয় হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না, বরং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি প্রতিদিন বাড়ছে।
দীর্ঘ ১২ বছর ধরে চলা এই সংঘাত ইয়েমেনকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জুলাই মাসে পুনরায় সংঘাত শুরুর পর থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বানি হুশাইশের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সামরিক সমাধানের পথে হাঁটলে সাধারণ নাগরিকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি অবিলম্বে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি পুনর্বহাল না করা হয়, তবে ইয়েমেনের জনপদগুলো আরও বেশি জনশূন্য ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে না, বরং একটি গোটা প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত করছে, যার দায় এড়ানোর সুযোগ কোনো পক্ষেরই নেই।



