বাণিজ্য

আরামকো থেকে এলএনজি কিনছে সরকার

আরামকো থেকে এলএনজি কিনছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাস চাহিদা মেটাতে সিঙ্গাপুরভিত্তিক আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি অব্যাহত রেখেছে সরকার। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি মোকাবিলা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে স্পট ও সরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবস্থায় এলএনজি সংগ্রহ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের অন্যতম এলএনজি সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে।

সরকারের অনুমোদিত ক্রয়প্রক্রিয়া অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক কোটেশন বা সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থার আওতায় আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে এলএনজি সংগ্রহ করছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সরকার পুরো বছরের জন্য আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে পাঁচটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেয়। ওই চুক্তিতে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (MMBtu) এলএনজির দাম নির্ধারণ করা হয় জাপান কোরিয়া মার্কার (JKM) সূচকের সঙ্গে ০.১৪৫ মার্কিন ডলার যোগ করে।

এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে জেএকেএম একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মূল্যসূচক। এশিয়ার স্পট এলএনজি বাজারের দামের সঙ্গে এই সূচক সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে যায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে সরবরাহ অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর স্পট এলএনজির বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়।

২০২৬ সালের মার্চে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে দুটি স্পট এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সে সময় একটি কার্গোর দাম প্রতি MMBtu ২০.৯৬ ডলার এবং অন্যটির দাম ২০.৯২ ডলার নির্ধারণ করা হয়। এর আগে বছরের শুরুতে এলএনজির স্পট মূল্য প্রায় ১০ থেকে ১২ ডলারের মধ্যে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহ সংকটের কারণে দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের সরবরাহ সংকট বড় ভূমিকা রাখে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে কাতারসহ গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারীদের এলএনজি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে এশিয়ায় এলএনজি আমদানি ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ১ কোটি ৮৭ লাখ ৪০ হাজার টনে নেমে যায়। কাতার ২০২৫ সালে ৮ কোটি ৯ লাখ টন এলএনজি রপ্তানি করেছিল, ফলে দেশটির সরবরাহে বিঘ্ন আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।

পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ে। দেশের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি সংগ্রহ করতে হয়। কারণ দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সার কারখানা ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এদিকে সরকার শুধু আরামকো নয়, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর কাছ থেকেও এলএনজি সংগ্রহ করছে। ২০২৫ সালের আগস্টে সরকার আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর ও পেট্রোচায়না ইন্টারন্যাশনাল সিঙ্গাপুর থেকে দুটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছিল। ওই সময়ে আরামকোর সরবরাহ করা একটি কার্গোর দাম ছিল ১১.৯৭ ডলার/MMBtu এবং পেট্রোচায়নার কার্গোর দাম ছিল ১১.৯০ ডলার/MMBtu।

একইভাবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে আরও একটি স্পট এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই কার্গোর মূল্য ছিল প্রায় ৪৯৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী অল্প সময়ের ব্যবধানেই এলএনজি আমদানির ব্যয়ে বড় পরিবর্তন ঘটছে।

২০২৬ সালের জুনেও সরকার দুটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেয়। এর একটি আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর এবং অন্যটি গানভর সিঙ্গাপুর সরবরাহ করার কথা। দুটি কার্গোর মোট মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। এ ক্রয়ও আন্তর্জাতিক কোটেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করা হয়।

আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর মূলত সৌদি আরামকোর এশিয়াভিত্তিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটি ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরে কার্যক্রম শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে তেলজাত পণ্যের পাশাপাশি এলএনজি বাণিজ্যেও যুক্ত হয়। এশিয়ার বাজারে তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ করাই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য।

বাংলাদেশের জন্য এলএনজি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হওয়া। আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে টার্মিনাল ব্যবহারের খরচ, পরিবহন, পুনর্গ্যাসীকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য বাড়লে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় আর্থিক চাপও বাড়ে।

তবে এলএনজি আমদানির প্রধান উদ্দেশ্য শুধু তাৎক্ষণিক ঘাটতি পূরণ নয়; বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাত সচল রাখাও এর গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সরকার ২০২৬ সালে আরামকো থেকে পাঁচটি কার্গো সংগ্রহের যে পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, তার লক্ষ্য ছিল দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং বিদ্যুৎ ও শিল্পে গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশের এলএনজি কেনার কার্যক্রম চলমান। তবে আপনার দেওয়া ২১.৫৫ ডলার/MMBtu দরটির বিষয়ে উন্মুক্ত সরকারি বা নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রে সরাসরি অনুমোদন-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ নিশ্চিতভাবে পাওয়া আরামকো-সম্পর্কিত স্পট কার্গোর দাম ছিল মার্চ ২০২৬-এ ২০.৯৬ ও ২০.৯২ ডলার/MMBtu। তাই ২১.৫৫ ডলারকে নিশ্চিত সরকারি ক্রয়মূল্য হিসেবে উল্লেখ না করাই তথ্যগতভাবে নিরাপদ।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা, কাতারসহ বড় রপ্তানিকারকদের সরবরাহ পরিস্থিতি এবং এশিয়ার স্পট বাজারের মূল্য—আগামী দিনে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির ব্যয় নির্ধারণে এসব বিষয়ই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।