নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে হামের সংক্রমণ ও হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২৮ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট মৃত্যুর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে ৯৫ শিশু। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৭৩৩ জন। অর্থাৎ মোট প্রাণহানির বড় অংশই হয়েছে এমন শিশুদের, যাদের মধ্যে হামের উপসর্গ ছিল, তবে পরীক্ষায় প্রত্যেকের ক্ষেত্রে হাম নিশ্চিত হয়নি।
এর আগে ২৬ জুলাই পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৮২০। ওই সময়ে হামের উপসর্গে ৭২৫ এবং নিশ্চিত হামে ৯৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পরবর্তী সময়ে আরও মৃত্যুর ঘটনায় মোট সংখ্যা ৮২৮-এ পৌঁছায়।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে দেশে হাম ও হামের উপসর্গের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহেও প্রতিদিন কয়েকশ থেকে এক হাজারের বেশি শিশুর মধ্যে হাম বা এর উপসর্গ শনাক্ত হওয়ার তথ্য এসেছে। ২৬ জুলাই এক দিনে ১ হাজার ১৬০ শিশুর মধ্যে হাম ও হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছিল। একই সময়ে ১৭০ শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয় এবং ৯৯০ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২৬ জুলাই পর্যন্ত ১৫ মার্চ থেকে দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৩। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছিল ১৫ হাজার ৪৪২ জনের। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম নিয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ২৩৯ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৬৭ জন।
মৃত্যুর দিক থেকে ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। ২২ জুলাই পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে ৩০৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। এরপর সিলেট বিভাগে ১০৫, রাজশাহীতে ৯০, ময়মনসিংহে ৬৭, চট্টগ্রামে ৫৬, বরিশালে ৪৩, খুলনায় ৩১ এবং রংপুরে ৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তী দিনগুলোতেও ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগে নতুন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
হামের প্রকোপে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। বিশেষ করে কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি জটিল আকার নেওয়ার ঝুঁকি বেশি। হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, অপুষ্টি এবং অন্যান্য জটিলতা যুক্ত হলে শিশুর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা এ কারণে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত তথ্য অনুযায়ী, জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। মে মাসের শুরুতে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত ১ কোটি ৭২ লাখ ৬৮ হাজার ৯০৮ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের প্রায় ৯৬ শতাংশ।
তবে টিকাদানের উচ্চ কভারেজের পরও নতুন রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরুরি টিকাদান নয়, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো শিশু বাদ পড়েছে কি না, আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং অপুষ্টিতে থাকা শিশুদের বিশেষ নজরদারিও জরুরি।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় শিশুদের টিকাদান, রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে কয়েক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। জুনের শেষ দিকে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু ৭০০ ছাড়িয়েছিল; ২৬ দিনের মধ্যে তা ৮০০ ছাড়ায়। ২২ জুলাই মোট মৃত্যু ছিল ৮০৩, ২৩ জুলাই ৮০৫, ২৫ জুলাই ৮১৬ এবং ২৬ জুলাই ৮২০। সর্বশেষ পাওয়া ২৮ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮২৮ জনে।
এ অবস্থায় জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে র্যাশসহ হামের উপসর্গ দেখা দিলে শিশুকে অন্যদের থেকে দূরে রেখে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে টিকাদান থেকে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা এবং হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রস্তুত রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ৮ আগস্ট পর্যন্ত ৮৬০-এর বেশি মৃত্যুর দাবি যাচাইযোগ্য সর্বশেষ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ যে সংখ্যাটি নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা গেছে, সেটি হলো ৮২৮ জন। নতুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন প্রকাশ হলে সংখ্যাটি পরিবর্তিত হতে পারে।