নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তুঙ্গে থাকলেও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও খেলাফত মজলিস এখনো নিজেদের চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ করেনি। রাষ্ট্রপতি পদে কাকে সমর্থন করবে, দলীয় প্রার্থী দেবে কি না কিংবা কোনো সমঝোতায় যাবে কি না—এসব বিষয়ে দলগুলোর অভ্যন্তরে আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর ২৪ জুলাই থেকে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পদটি শূন্য হওয়ার পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেবে, সে বিষয়ে দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম বা সমর্থনের ঘোষণা দেয়নি। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে দলগুলোর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান, সংসদে তাদের শক্তি এবং ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে বিষয়টি রাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় নিয়েও এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে এবং তফসিল ঘোষণার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। কমিশন দ্রুত তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতিও নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ২৫ জুলাই জানিয়েছেন, আগামী সেপ্টেম্বরের জাতীয় সংসদ অধিবেশনেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে—এমন কোনো সরকারি ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার আগে আরও কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী নাকি নির্দলীয় বা দলের বাইরের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে সমর্থন করা হবে, সে বিষয়ে বিএনপির মধ্যেও আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক ব্যক্তির নাম আলোচনায় এলেও কোনো নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অবস্থান এ কারণে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে যে, জাতীয় সংসদে বিএনপির পাশাপাশি এই দলগুলোরও উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদ সদস্যদের ভোটে হওয়ায় কোনো প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে সংসদীয় সমর্থনের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি দলগুলোর অবস্থানও প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
এর মধ্যে খেলাফত মজলিসের রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে। ২৫ জুলাই দলটি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াত, এনসিপি ও খেলাফত মজলিসের অবস্থান কতটা অভিন্ন থাকবে, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি ভোটের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ সদস্যরা ভোট দেন। ফলে নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর সংসদীয় অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা নয়, দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা ও সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবও বিবেচনায় আসবে।
বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হলো—বিএনপি কাকে রাষ্ট্রপতি পদে সমর্থন করবে এবং জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও খেলাফত মজলিস সেই প্রার্থীর পক্ষে যাবে, নাকি পৃথক অবস্থান নেবে। দলগুলোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো নাম বা সমীকরণকে চূড়ান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আলোচনা দ্রুত এগোলেও প্রার্থী ও সমর্থনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হয়নি। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের পরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রকৃত সমীকরণ পরিষ্কার হবে। বর্তমানে নিশ্চিত তথ্য হলো—রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়েছে, স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে রয়েছেন এবং সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে সংসদের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা রয়েছে।