নিজস্ব প্রতিবেদক:
বর্ষাকালে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বৃষ্টির পানি জমে থাকা বিভিন্ন স্থান এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত রোগীর চাপের দিক থেকে ঢাকা এখনো দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বর্ষাকালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এর আগে দেওয়া নদীবন্দর সতর্কবার্তাগুলোতেও দেশের একাধিক অঞ্চলে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া এবং বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকলে কোথাও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে, আবার কোনো কোনো এলাকায় ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলে দমকা হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির সময় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। নদীবন্দরগুলোর জন্যও পরিস্থিতি অনুযায়ী সতর্কসংকেত জারি করা হয়।
এদিকে বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এলাকার রোগীর তথ্য আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগের পরিস্থিতি ডেঙ্গু নজরদারির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও জুলাই ও আগস্টে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছে। গত ২ জুলাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছিলেন, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রস্তুতি নিয়েছে। থানা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু শনাক্তের এনএস১ পরীক্ষার কিট পাঠানোর পাশাপাশি ঢাকা ও দেশের বড় শহরগুলোর হাসপাতালগুলোও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। জুলাই মাসে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ে এনএস১ পরীক্ষা বিনামূল্যে করার বিষয়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের নির্দেশনাও জারি হয়েছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরীক্ষার কিট সরবরাহেও সহায়তা করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জুলাইয়ের শুরুতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ৪০ হাজারের বেশি এনএস১ ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট দিয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল ডেঙ্গু শনাক্তকরণে স্বাস্থ্য বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য সংক্রমণ মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করা।
বৃষ্টির পানি জমে থাকা, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ, ছাদ ও আশপাশের ছোট জলাধার এডিস মশার প্রজননস্থল হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে বর্ষায় নিয়মিত বৃষ্টির সঙ্গে নগর এলাকায় পানি জমে থাকলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে এ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জমে থাকা পানি অপসারণকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সিটি করপোরেশন বা স্বাস্থ্য বিভাগের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণস্থল ও আশপাশের পরিবেশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। একই সঙ্গে জ্বর, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা বা ডেঙ্গুর অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
একদিকে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা, অন্যদিকে বর্ষাজনিত এডিস মশার বিস্তার—দুই পরিস্থিতিই জনস্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি সতর্কতার দাবি রাখছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতিও দ্রুত বদলাতে পারে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং নাগরিক সচেতনতা—এই চার ক্ষেত্রেই সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।