নিজস্ব প্রতিবেদক:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে অচলাবস্থার মধ্যেই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে নতুন চুক্তিতে সই করেছে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) মক্কায় স্বাক্ষরিত এ চুক্তিতে তিন দেশ সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামো জোরদার এবং এক দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার নীতি গ্রহণ করেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরান ও ওমানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আশাবাদ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
চুক্তিটি এমন সময়ে হলো, যখন ইরানকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন চুক্তিকে তিন দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তির আওতায় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক সমন্বয় ও যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদারের লক্ষ্য রয়েছে। তবে চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে সম্ভাব্য শত্রু বা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলেছেন, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে এর আগেই একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, দুই দেশের যেকোনো একটির ওপর আগ্রাসন উভয়ের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে। চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো, যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় অবদান রাখা।
ওই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের নজিরও পাওয়া গেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, পাকিস্তানের একটি সামরিক বাহিনী ও পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানসহ সহায়ক উড়োজাহাজ সৌদি আরবে পৌঁছেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, দুই দেশের কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় যৌথ সামরিক সমন্বয় ও প্রস্তুতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ওই বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যেও সামরিক সহযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এপ্রিলে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সামরিক সংলাপে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশই তাদের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
নতুন ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা একই কাঠামোয় আরও ঘনিষ্ঠ হলো। বিশ্লেষকদের কাছে এর তাৎপর্য শুধু সামরিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়; মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ সংকটে তিন দেশের সমন্বিত অবস্থানের সম্ভাবনাও এতে যুক্ত হয়েছে। তবে চুক্তিটি কোনো নতুন সামরিক জোট হিসেবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন কাঠামো, যৌথ সামরিক ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ওপর।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি সমঝোতা হতে পারে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হবে। ওই সমঝোতা হলে ইরানের বন্দর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধও প্রত্যাহারের পথ তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও অবাধ নৌ চলাচল নিয়ে এর আগেও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানিয়েছিলেন, এর প্রথম ধাপ হিসেবে হরমুজ প্রণালী দ্রুত বাণিজ্যিক নৌযানের জন্য খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ তুলে নেবে।
সৌদি আরবও হরমুজ প্রণালীতে অবাধ নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে স্থায়ী শান্তি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর জোর দেয় রিয়াদ।
হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আশাবাদ এবং একই সময়ে সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি—দুটি ঘটনাই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা সক্ষমতা ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সংঘাতের প্রভাব কমিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সচল করার জন্য কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছে।
তবে হরমুজ প্রণালী নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়েছে—এমন ঘোষণা পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আশাবাদকে তাই সম্ভাব্য কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে নয়। একইভাবে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা সমীকরণ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। মক্কায় তিন দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি আঞ্চলিক সামরিক সহযোগিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, আর হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করার সম্ভাব্য সমঝোতা বিশ্ব জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য স্বস্তির বার্তা হতে পারে। আগামী দিনগুলোতে এই দুই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা অগ্রসর হয়, সেটিই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।