বিশ্ব

কুককে সরাতে ট্রাম্পের ফের উদ্যোগ, বলরুমে আদালতের বাধা

কুককে সরাতে ট্রাম্পের ফের উদ্যোগ, বলরুমে আদালতের বাধা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্তের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের নতুন বলরুম নির্মাণ নিয়েও তাঁর প্রশাসন বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে পড়েছে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) ফেড গভর্নর কুককে সরানোর প্রচেষ্টা নতুন করে সামনে আসার পাশাপাশি একই দিনে ফেডারেল আপিল আদালত কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।

লিসা কুককে বরখাস্তের বিষয়টি নতুন নয়। ২০২৫ সালের আগস্টে ট্রাম্প প্রথমবার তাঁকে সরানোর চেষ্টা করেন। কুকের বিরুদ্ধে বন্ধকী ঋণ বা মর্টগেজ-সংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগ তোলা হলেও তাঁর আইনজীবী এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কুক ওই পদ থেকে অপসারণ ঠেকাতে আদালতের দ্বারস্থ হন। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টও জুন ২০২৬-এ আগের অপসারণ-প্রচেষ্টা নিয়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া সুরক্ষা বহাল রাখার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেয়।

এবার হোয়াইট হাউস থেকে কুককে দেওয়া নতুন চিঠিতে তাঁকে মর্টগেজ-সংক্রান্ত অভিযোগের জবাব দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুককে তিন সপ্তাহের মধ্যে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রশাসন আগের আইনি বাধা অতিক্রম করে তাঁকে অপসারণের নতুন পথ তৈরির চেষ্টা করছে বলে বিষয়টি বিশ্লেষিত হচ্ছে।

কুককে সরানোর প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফেডারেল রিজার্ভ ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক নির্বাহী বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে মুদ্রানীতি পরিচালনার জন্য স্বাধীনতা ভোগ করে। সুপ্রিম কোর্টের জুনের নথিতেও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। ফলে একজন গভর্নরকে প্রেসিডেন্টের সরাসরি অপসারণের চেষ্টা ফেডের স্বাধীনতা ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা নিয়ে বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে।

অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আদালতের বিরোধ তীব্র হয়েছে। শুক্রবার ওয়াশিংটন ডিসি সার্কিট কোর্ট অব আপিল ২-১ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নিম্ন আদালতের নির্দেশ বহাল রাখে। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।

প্রায় ৪০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই বলরুমের আয়তন প্রায় ৯০ হাজার বর্গফুট। প্রকল্পটির জায়গা তৈরি করতে হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক ইস্ট উইং ভেঙে ফেলা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, প্রকল্পটি ব্যক্তিগত অনুদানে অর্থায়ন করা হচ্ছে এবং এতে করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে না। ট্রাম্পের যুক্তি, হোয়াইট হাউসে বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের জন্য বর্তমান স্থাপনা যথেষ্ট নয়।

প্রকল্পটির বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর হিস্টোরিক প্রিজারভেশনসহ সংরক্ষণবাদী পক্ষ আদালতে যায়। তাদের বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট এককভাবে এত বড় ধরনের নির্মাণ ও ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিবর্তনের অনুমতি দিতে পারেন না। নিম্ন আদালতও আগেই নির্মাণকাজে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। আপিল আদালত এবার সেই অবস্থান বহাল রাখায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইনি লড়াই আরও কঠিন হলো।

আদালতের সিদ্ধান্তে অবশ্য হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি পুরোপুরি অচল হয়ে যায়নি; তবে বলরুমের মূল ওপরের কাঠামো নির্মাণের কাজ আদালতের নির্দেশের আওতায় পড়েছে। প্রশাসন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

ট্রাম্প আদালতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, বলরুমটি ব্যক্তিগত অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে এবং কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন—আদালতের এমন ব্যাখ্যা তিনি মানেন না। তাঁর প্রশাসনের যুক্তি হলো, হোয়াইট হাউসের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণে প্রেসিডেন্টের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। আদালত অবশ্য প্রকল্পের ব্যাপকতা ও আইনি কর্তৃত্বের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছে।

একই সময়ে কুককে অপসারণের নতুন উদ্যোগ এবং বলরুম নির্মাণে আদালতের বাধা ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নিয়ে দুটি পৃথক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াইকে সামনে এনেছে। একটি ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে প্রেসিডেন্ট কতটা স্বাধীনভাবে ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নরকে সরাতে পারেন; অন্য ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া হোয়াইট হাউসের মতো ফেডারেল সম্পত্তিতে বড় ধরনের স্থাপনা নির্মাণের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের আছে কি না।

এখন কুককে সরানোর ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে তাঁর দেওয়া জবাব, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য নতুন মামলার ওপর। আর বলরুম প্রকল্পের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে নির্মাণকাজের ভবিষ্যৎ সেই আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। ফলে ওয়াশিংটনে একই সময়ে ফেডের স্বাধীনতা ও প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াই আরও জোরালো হয়েছে।