নিজস্ব প্রতিবেদক:
ফসল উৎপাদনের পর সংরক্ষণের অভাবে কৃষককে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার দীর্ঘদিনের সমস্যা কমাতে সারাদেশে প্রায় ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব ক্ষুদ্র হিমাগার স্থাপনের কথা জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি এসব সংরক্ষণাগার স্থাপনের ফলে কৃষক অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ছাড়াই ফসল সংরক্ষণ করে বাজারে অনুকূল সময়ে বিক্রি করতে পারবেন।
মন্ত্রী গত ১৭ জুলাই চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারিদের মধ্যে ধানবীজ ও কৃষি উপকরণ বিতরণ এবং গবাদিপশুকে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। এর আগে ১৫ জুন রাজধানীতে কৃষি খাত নিয়ে আয়োজিত একটি নীতিবিষয়ক সভায়ও তিনি একই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেছিলেন।
কৃষিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কৃষক উৎপাদন করলেও সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে বিশেষ করে সবজি ও অন্যান্য পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মৌসুমে দাম কমে যায়। তখন দ্রুত পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে কৃষক অনেক সময় উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না। এই সমস্যা মোকাবিলায় কৃষকের কাছাকাছি সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনায় বড় হিমাগারের পরিবর্তে ছোট আকারের মিনি কোল্ড স্টোরেজকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে বড় হিমাগার থাকলেও অনেক কৃষকের খেত থেকে সেগুলোর দূরত্ব বেশি হওয়ায় পরিবহন ব্যয় ও পণ্য ওঠানামার খরচ বেড়ে যায়। ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য এ ব্যয় অনেক সময় সংরক্ষণের সুবিধার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়। উৎপাদন এলাকার কাছেই মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করলে সেই বাড়তি ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব মিনি কোল্ড স্টোরেজ ১৫ থেকে ২০ জন কৃষককে নিয়ে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে এগুলো সৌরবিদ্যুৎচালিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের হিসাবে প্রায় ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা গেলে প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি এ সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।
সরকারের এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু ফসল সংরক্ষণ নয়; উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। কৃষক যদি ফসল তোলার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে ছাড়তে বাধ্য না হন, তাহলে অতিরিক্ত সরবরাহের সময়ে দাম পড়ে যাওয়ার চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। কৃষক পণ্য ধরে রেখে বাজারে চাহিদা ও দামের অনুকূল সময়ের অপেক্ষা করতে পারবেন। এতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।
এ উদ্যোগের সঙ্গে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজার চাহিদার মধ্যে সমন্বয় তৈরির পরিকল্পনাও যুক্ত করা হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার ডাটাবেসভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে। এর মাধ্যমে কোন এলাকায় কী পরিমাণ জমিতে কোন ধরনের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে এবং বাজারে তার চাহিদা কত—এসব তথ্য বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদন পরিকল্পনা করা হবে। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে বাজারে হঠাৎ সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
মিনি কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এরই মধ্যে হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে সাভারে স্থাপিত মিনি কোল্ড স্টোরেজে কৃষকের উৎপাদিত বিভিন্ন সবজি ও ফল সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ২৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল ওই স্থাপনা পরিদর্শন করে। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা কৃষক পর্যায়ে স্বল্প পরিসরের আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থাকে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেন।
এর আগেও কৃষকের মিনি কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছিল। সাভারে একটি পাকা ভবনকে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজে রূপান্তর এবং আরেকটি কনটেইনারভিত্তিক সৌরচালিত কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হয়। সেখানে টমেটো, শসা, লাউ, বিটরুট, ক্যাপসিকাম, বেগুন, গাজর, ফুলকপিসহ বিভিন্ন শাকসবজি ও ফল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগের পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় কনটেইনারভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনে প্রায় ১৫ লাখ টাকা এবং পাকা ভবনে মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের তুলনামূলক ছোট ও স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবস্থা কৃষকের কাছে সংরক্ষণ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় হিমাগারের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ঘাটতির প্রভাব শুধু কৃষকের আয়েই পড়ে না; ভোক্তা পর্যায়েও এর প্রভাব দেখা যায়। কোনো মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলে বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য আসে এবং দাম কমে যায়। আবার কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর একই পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে দাম বেড়ে যেতে পারে। সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সময়ের মধ্যে ব্যবধান তৈরি করা সম্ভব হবে, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে তুলনামূলক স্থিতিশীল করতে পারে।
তবে মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের পাশাপাশি এগুলোর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বা সৌরব্যবস্থার কার্যকারিতা, সংরক্ষণ খরচ এবং কৃষকের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই কৃষক উপকৃত হবেন না; স্থানীয় কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়ায় সংরক্ষণের সুযোগ এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার দেশব্যাপী কৃষকের ডিজিটাল ডাটাবেস তৈরির কাজও এগিয়ে নিচ্ছে। ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে কোন অঞ্চলের কোন কৃষক কত জমিতে কী ধরনের ফসল উৎপাদন করছেন, সে তথ্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব তথ্য ব্যবহার করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী।
সরকারের সাম্প্রতিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে প্রায় ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি সংরক্ষণব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং কৃষক সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পচনশীল কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো, কৃষকের পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং অনুকূল সময়ে পণ্য বিক্রির সুযোগ বাড়তে পারে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এটি এখনো সারাদেশে ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের ঘোষিত পরিকল্পনা; সবগুলো স্থাপনা ইতোমধ্যে চালু হয়েছে—এমন তথ্য নেই। তবে পরীক্ষামূলক কিছু মিনি কোল্ড স্টোরেজ কার্যক্রমে রয়েছে এবং সরকার এগুলো পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের গতি, কৃষকদের জন্য সংরক্ষণ খরচ এবং প্রত্যন্ত উৎপাদন এলাকায় সুবিধা পৌঁছানো—এসব বিষয়ই এখন উদ্যোগটির সাফল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।