মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার কাউরাইদ ও মশাখালি স্টেশনের মাঝামাঝি বড়াইগ্রাম এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা দেওয়ানগঞ্জগামী আন্তঃনগর তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনটির একটি বগি হঠাৎ হুক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চলন্ত ট্রেন থেকে বগি আলাদা হয়ে যাওয়ার এই আকস্মিক ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ট্রেনের চালক তাৎক্ষণিকভাবে বগি বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে ট্রেনটি থামিয়ে দিলে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির হাত থেকে রক্ষা পান শত শত যাত্রী। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই চলন্ত অবস্থায় বগির হুক খুলে যাওয়ার এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছে, যা রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ট্রেনে থাকা ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, বগি বিচ্ছিন্ন হওয়ার মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত ভীতিকর এবং ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে চরম অবহেলা বিদ্যমান। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীরা জানান, ট্রেনটি যখন বড়াইগ্রাম এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন হঠাৎ এক বিকট শব্দে বগিটি মূল ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে আলাদা হয়ে যায়। যাত্রীদের ভাষ্যমতে, এ ধরনের ঘটনা কোনো সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটি নয় বরং নিয়মিত তদারকির অভাবের বহিঃপ্রকাশ। চলন্ত ট্রেনের বগি বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো ঘটনা যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রেলওয়ের যে দুর্বলতা রয়েছে, তা স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রতিনিয়ত এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত সাধারণ মানুষের মধ্যে রেলভ্রমণ নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি করছে এবং যাত্রীরা এখন প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কের মধ্য দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকেন।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আকতার হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং রেলওয়ের কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সকাল ১১টার দিকে বিচ্ছিন্ন বগিটি পুনরায় হুকের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়। তবে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ঠিক কী কারণে হুকটি খুলে গিয়েছিল বা বগির কানেক্টিং পয়েন্টে কোনো ক্ষয় বা ত্রুটি আগে থেকে ছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তদন্ত প্রতিবেদনের কথা তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের দাবি, ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল এবং কোনো রুটে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি, কিন্তু নিরাপত্তা ত্রুটির এই দায়ভার কে নেবে তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। জরুরি ভিত্তিতে প্রতিটি ট্রেনের বগি কানেক্টিং হুক ও মেকানিক্যাল পার্টস পরীক্ষার জোরালো দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা।
এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং এটি দেশের রেলওয়ে খাতে চলমান রক্ষণাবেক্ষণ সংকটের একটি বড় সতর্কবার্তা। যদি ট্রেনটি উচ্চগতিতে থাকা অবস্থায় বগিটি বিচ্ছিন্ন হতো, তবে বড় ধরনের ট্র্যাজেডি ও প্রাণহানির সম্ভাবনা ছিল শতভাগ। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেলওয়ের প্রতিটি বগির ফিটনেস পরীক্ষা এবং যান্ত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন সময়ের দাবি। শুধুমাত্র যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই, বরং এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা গাফিলতি চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে রেলপথে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।