নিজস্ব প্রতিবেদক
আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় শিল্পাঞ্চলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অর্ডার কমে যাওয়া ও উৎপাদন পরিস্থিতির অবনতিকে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তৈরি পোশাক খাতে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, ক্রয়াদেশ হ্রাস এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব যখন দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে পড়ছে, তখন আশুলিয়ায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারানোর ঘটনা পরিস্থিতির গভীরতা সামনে এনেছে।
আশুলিয়া দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চল। ঢাকার উপকণ্ঠের এই এলাকায় শত শত পোশাক কারখানায় বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মরত। ফলে একটি কারখানায় বড় পরিসরে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় পরিবহন, বাসাবাড়ি, খাবারের দোকানসহ শ্রমিকনির্ভর পুরো অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে।
সাম্প্রতিক শিল্পাঞ্চলভিত্তিক তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে আশুলিয়ায় ৩৫টি কারখানা প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। সারা দেশের ছয়টি শিল্পাঞ্চলে একই সময়ে ৭৯টি কারখানা ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিকের কর্মসংস্থান বন্ধ করেছে। শিল্প পুলিশের তথ্যভিত্তিক এই পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটেছে আশুলিয়ায়।
শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পেছনে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা দুর্বল হওয়া, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়ে চাপের কারণে অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশুলিয়ার কারখানাগুলোতে বড় কিছু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ক্রয়াদেশ কমেছে এবং কিছু উৎপাদন দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা গেছে।
এ পরিস্থিতিতে ৫৬৫ শ্রমিকের ছাঁটাইকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং আশুলিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তারই অংশ হিসেবে ঘটনাটিকে দেখতে হচ্ছে। একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট কারখানায় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে অর্ডার কমে যাওয়ার কারণটি কতটা বাস্তব এবং কারখানাটির উৎপাদন ও আর্থিক পরিস্থিতি কী—সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
এর আগে চলতি বছরের জুনে সাভার ও আশুলিয়ায় আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি পোশাক কারখানা থেকে মোট ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা সামনে আসে। এর মধ্যে উলাইলে একে এম নিটওয়্যার লিমিটেড থেকে ১ হাজার ২৮৬ জন, রেডিও কলোনি এলাকার প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার থেকে ৫২৯ জন এবং আশুলিয়ার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস থেকে ৫৩ জন শ্রমিক ছাঁটাই হন।
ওই ঘটনায় আল-মুসলিম গ্রুপ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ব্যবসায় মন্দাভাব ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটাই করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছিল, শ্রমিকদের আইন অনুযায়ী প্রাপ্য পাওনা ও অন্যান্য সুবিধা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে শ্রমিকদের একটি অংশ ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলে আন্দোলনে নামেন এবং চাকরিতে পুনর্বহাল ও পাওনা পরিশোধের দাবি জানান।
আশুলিয়ায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রবণতা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেও জামগড়া এলাকার দ্য ড্রেস অ্যান্ড দ্য আইডিয়াস নামের একটি পোশাক কারখানায় ৪০০-এর বেশি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটে। তখন কর্তৃপক্ষ ‘কাজের অভাব’ দেখিয়ে কারখানার একটি ইউনিট বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল। শিল্প পুলিশও পর্যাপ্ত কাজ না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল।
এই ধারাবাহিকতা তৈরি পোশাক খাতের সামনে থাকা বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, ক্রয়াদেশের ওঠানামা, উৎপাদন ব্যয়, শ্রম ব্যয় এবং সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন—সবকিছুর চাপ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে কারখানাগুলোকে।
অর্ডার কমে গেলে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার একটি অংশ অব্যবহৃত থাকে। এতে শ্রমিকের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। তবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আগে কারখানার কর্তৃপক্ষের উচিত শ্রম আইন, নিয়োগের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা। কারণ একটি শ্রমিকের চাকরি হারানো মানে তাঁর পরিবারের নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
বিশেষ করে পোশাকশ্রমিকদের বড় একটি অংশ মাসিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল। চাকরি হারানোর পর নতুন কর্মসংস্থান দ্রুত না পেলে তাঁদের পরিবারে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। আশুলিয়ার মতো শ্রমিকনির্ভর এলাকায় একসঙ্গে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারালে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শ্রমিকদের দিক থেকে তাই ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারখানায় অর্ডার কতটা কমেছে, উৎপাদন কতটা কমেছে, কেন শ্রমিক সংখ্যা কমানো প্রয়োজন হয়েছে এবং ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য থাকলে শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ কমানো সম্ভব।
অন্যদিকে কারখানা মালিকদের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে গেলে বা উৎপাদন অন্য দেশে চলে গেলে কারখানার আয় কমতে পারে। সেই অবস্থায় লোকসান কমাতে উৎপাদন পুনর্গঠন বা জনবল কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে এমন সিদ্ধান্তের সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করাও শিল্প ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আশুলিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও একটি বিষয় সামনে এনেছে—শুধু নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়াই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদে শিল্পাঞ্চলের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, জ্বালানি ও অবকাঠামো সুবিধা উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা ছাড়া কর্মসংস্থান স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।
একই সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো দরকার। কোনো কারখানায় অর্ডার কমে যাওয়ার কারণে শ্রমিক ছাঁটাই হলে তাঁদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা না গেলে সামগ্রিক বেকারত্বের চাপ বাড়বে। তাই শিল্পাঞ্চলভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি ও পুনঃনিয়োগের ব্যবস্থা কার্যকর করা যেতে পারে।
সরকার, শিল্প মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়ও প্রয়োজন। কোনো কারখানায় বড় পরিসরে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা দেখা দিলে পরিস্থিতি আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া গেলে আকস্মিক বেকারত্বের ধাক্কা কিছুটা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আইনগত পাওনা নিশ্চিত করতে শিল্প পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক তথ্যের দিকে তাকালে আশুলিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শুধু একটি কারখানায় ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাই নয়, বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই শিল্পাঞ্চলটির ৩৫টি কারখানায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক চাকরি হারানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে প্রতিটি ছাঁটাইয়ের কারণ ও আইনগত প্রক্রিয়া আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ অর্ডার কমে যাওয়া সত্য হলে সেটি শিল্পের বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত; আবার আইন না মেনে শ্রমিক ছাঁটাই করা হলে সেটি শ্রম অধিকার ও আইনি জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করবে।
আশুলিয়ার পোশাকশিল্প তাই এখন এক ধরনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ও ক্রয়াদেশ ধরে রাখার চাপ, অন্যদিকে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবিকার নিরাপত্তা—দুই দিকই সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প টিকিয়ে রাখতে যেমন কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা দরকার, তেমনি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
৫৬৫ শ্রমিকের ছাঁটাইয়ের ঘটনা সেই দ্বৈত সংকটকেই নতুন করে সামনে এনেছে। অর্ডার কমে যাওয়ার কারণে যদি সত্যিই উৎপাদন সংকুচিত হয়ে থাকে, তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, নতুন বাজার সৃষ্টি ও ক্রয়াদেশ ধরে রাখার কৌশল প্রয়োজন। আর শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন স্বচ্ছ ছাঁটাই প্রক্রিয়া, আইন অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ এবং দ্রুত বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।
আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানকেন্দ্র। সেখানে একের পর এক শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত থাকলে বিষয়টি শুধু একটি কারখানার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে চলবে না। এর পেছনে থাকা বাজার, উৎপাদন, রপ্তানি ও শ্রম পরিস্থিতি সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করে কর্মসংস্থান রক্ষার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।