বাণিজ্য

অর্ডার কমে আশুলিয়ায় ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাই

অর্ডার কমে আশুলিয়ায় ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাই

সাভার প্রতিনিধি:

অর্ডার কমে যাওয়াকে কারণ দেখিয়ে ঢাকার আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় ৫৬৫ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে কাজের অর্ডার কমে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম সীমিত করতে হয়েছে। এর প্রভাবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল হয়ে পড়া শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

শ্রমিক ছাঁটাইয়ের এ ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন আশুলিয়ার পোশাকশিল্পে অর্ডার সংকট নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান আশুলিয়ার কিছু কারখানা থেকে অর্ডার কমিয়ে দেশের অন্য অঞ্চলের কারখানায় উৎপাদন সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখিয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা এর পেছনে আগের শ্রমিক অসন্তোষ, সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আশুলিয়া দেশের অন্যতম প্রধান পোশাকশিল্প এলাকা। সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলের হাজারো পোশাকশ্রমিকের জীবিকা সরাসরি এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি কারখানায় কয়েক শ শ্রমিকের চাকরি হারানোর ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের আয় বন্ধ হওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে তাদের পরিবারগুলোর খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হয়।

শ্রমিকদের ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে অর্ডার কমে যাওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এলেও শ্রমিকদের পাওনা, চাকরি হারানোর প্রক্রিয়া এবং শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের কী সুবিধা দেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ছাঁটাই করা শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি, ক্ষতিপূরণ বা অন্যান্য আইনগত পাওনা যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও শ্রম সংগঠনগুলোর বক্তব্য জানা প্রয়োজন।

আশুলিয়ায় এর আগেও অর্ডার সংকটের কারণে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জামগড়ার দ্য ড্রেস অ্যান্ড দ্য আইডিয়াস নামের একটি পোশাক কারখানায় ৪০০-এর বেশি শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। কারখানা কর্তৃপক্ষ তখন কাজের অভাবকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। শিল্প পুলিশও কারখানাটিতে কাজ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল।

অর্ডার সংকটের পাশাপাশি আশুলিয়ার পোশাকশিল্প সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক অসন্তোষ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও দেখেছে। ২০২৪ সালের শ্রমিক আন্দোলনের সময় আশুলিয়ায় একাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং সংঘাতের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। ওই সময় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

এর পরবর্তী সময়েও কিছু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড আশুলিয়ার কারখানা থেকে অর্ডার কমিয়ে দেশের অন্য এলাকায় উৎপাদন সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্পেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বড় ব্র্যান্ড আশুলিয়াকে তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে উৎপাদন অন্যত্র সরানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়। একই সময়ে চীন থেকে কিছু অতিরিক্ত অর্ডার বাংলাদেশে এলেও সেগুলো সব কারখানায় সমানভাবে পৌঁছায়নি।

এদিকে দেশের পোশাকশিল্পের ওপর আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনও চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতি, ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে পোশাক রপ্তানিকারকদের অর্ডার ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে ক্রেতারা এখন মূল্য, সরবরাহের সময়, উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রমপরিবেশ এবং রাজনৈতিক-সামাজিক স্থিতিশীলতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করছে। কোনো শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে ক্রেতারা বিকল্প কারখানা বা বিকল্প দেশ বেছে নেওয়ার সুযোগ রাখে। আশুলিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে অর্ডার স্থানান্তরের প্রবণতার পেছনেও এসব বিষয় কাজ করেছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

তবে অর্ডার কমে যাওয়ার কারণে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে সরাসরি আঘাত। একজন শ্রমিকের চাকরি হারানোর সঙ্গে তার পুরো পরিবারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে পোশাকশিল্পে কর্মরত অনেক শ্রমিকের মাসিক আয়ই পরিবারের প্রধান বা একমাত্র নিয়মিত আয়ের উৎস। ফলে হঠাৎ ছাঁটাই হলে নতুন কর্মসংস্থান না পাওয়া পর্যন্ত পরিবারকে ঋণ, সঞ্চয় বা স্বজনের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

২০২৬ সালের জুনেও সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলে বড় আকারের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি পোশাক কারখানা থেকে মোট ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হলে শ্রমিকেরা কারখানার সামনে বিক্ষোভ করেন। এর মধ্যে উলাইলে একে এম নিটওয়্যার লিমিটেড থেকে ১ হাজার ২৮৬, রেডিও কলোনির প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার থেকে ৫২৯ এবং আশুলিয়ার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস থেকে ৫৩ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। পরে শিল্প পুলিশ ও কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের পাওনা-সংক্রান্ত অভিযোগ যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমাধানের আশ্বাস দেয়।

এই ধারাবাহিকতা বিবেচনায় ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। অর্ডার কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সতর্কতা এবং শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ঝুঁকি—এসব কারণ একসঙ্গে পোশাকশিল্পের কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে যেসব কারখানা অর্ডার ধরে রাখতে পারছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন সচল থাকলেও অর্ডারের ওঠানামার কারণে শ্রমিক চাহিদায় পরিবর্তন ঘটছে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সাধারণত এ ধরনের ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, শ্রম আইন অনুসরণ এবং শ্রমিকদের সব ধরনের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করার দাবি ওঠে। কারণ অর্ডার কমে যাওয়া কারখানা কর্তৃপক্ষের ব্যবসায়িক বাস্তবতা হলেও এর দায় পুরোপুরি শ্রমিকের ওপর চাপানো হলে কর্মসংস্থান ও শ্রমিক অধিকার—দুই ক্ষেত্রেই সংকট তৈরি হতে পারে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশকে শুধু কম দামের পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদন বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ, শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শিল্পাঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সর্বশেষ পরিস্থিতিতে আশুলিয়ার ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় মূল প্রশ্ন এখন অর্ডার সংকট কতটা সাময়িক এবং কতটা দীর্ঘস্থায়ী। যদি ক্রেতাদের অর্ডার দ্রুত না বাড়ে, তাহলে আরও কারখানায় উৎপাদন কমানো ও জনবল পুনর্বিন্যাসের চাপ তৈরি হতে পারে। আর অর্ডার পরিস্থিতির উন্নতি হলে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের একটি অংশ পুনরায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারেন।

তবে এ ঘটনায় ছাঁটাই হওয়া ৫৬৫ শ্রমিকের নাম, সংশ্লিষ্ট কারখানার নাম, ছাঁটাইয়ের তারিখ এবং তাদের পাওনা পরিশোধের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিতভাবে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে নিশ্চিত দাবি করা যাচ্ছে না। তাই কারখানা কর্তৃপক্ষের অর্ডার কমে যাওয়ার দাবিকে ভিত্তি করেই ঘটনাটি দেখা হচ্ছে; শ্রমিকদের বক্তব্য ও সরকারি শ্রম পরিদর্শন সংস্থার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির আরও নির্ভুল চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।