আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে জুলাইয়ে অপ্রত্যাশিত দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। দেশটিতে জুলাই মাসে নন-ফার্ম খাতে কর্মসংস্থান ২৩ হাজার কমেছে। পাঁচ মাসের মধ্যে প্রথমবার কর্মসংস্থান কমার পাশাপাশি আগের দুই মাসের চাকরি বৃদ্ধির হিসাবও বড় ধরনের সংশোধন করা হয়েছে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিএলএসের তথ্য অনুযায়ী, জুনে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সংশোধিত হিসাব দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০ হাজারে। এর আগে জুনে ৫৭ হাজার চাকরি যোগ হওয়ার হিসাব দেওয়া হয়েছিল। মে ও জুন মিলিয়ে আগের হিসাবের তুলনায় ১ লাখ ৩ হাজার কম চাকরি যুক্ত হয়েছে বলে সংশোধিত তথ্যে দেখা গেছে। ফলে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে নিয়োগের গতি প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল ছিল বলে স্পষ্ট হচ্ছে।
জুলাইয়ের ২৩ হাজার চাকরি কমার বিষয়টি অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসেরও বিপরীত। এর আগে রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদেরা জুলাইয়ে প্রায় ৮০ হাজার নতুন চাকরি যোগ হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। সেই পূর্বাভাসের বিপরীতে প্রকৃত কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় মার্কিন অর্থনীতির বর্তমান গতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্বের হার ৪.২ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ৪.১ শতাংশ হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি শ্রমবাজারের জন্য ইতিবাচক তথ্য হলেও এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে শ্রমশক্তিতে মানুষের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া। জুলাইয়ে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৬১.৪ শতাংশে নেমে গেছে, যা প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার মানুষ শ্রমবাজারের বাইরে চলে যাওয়ায় বেকারত্বের হার কমেছে।
অর্থাৎ বেকারত্ব কমেছে মূলত বেশি মানুষ চাকরি পাওয়ার কারণে নয়; বরং কাজ খোঁজা মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বেকারত্বের হিসাব কিছুটা নেমেছে। শ্রমবাজারের এই প্রবণতা নিয়ে অর্থনীতিবিদেরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক তথ্যকে ‘ধীরে নিয়োগ, ধীরে ছাঁটাই’ ধরনের শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
জুলাইয়ে চাকরি কমার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা এবং অবকাশ ও আতিথেয়তা খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিপরীতে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে কিছু কর্মসংস্থান বেড়েছে। ফলে শ্রমবাজারের দুর্বলতা সব খাতে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি; বরং নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে কর্মসংস্থান সংকোচনের প্রভাব সামগ্রিক হিসাবে পড়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও নির্মাণ খাতে চাকরি বাড়লেও আর্থিক খাতের পরিস্থিতি তুলনামূলক দুর্বল। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক কার্যক্রম খাতে ১৪ হাজার চাকরি কমেছে। গত বছরের মে মাসের শীর্ষ অবস্থানের তুলনায় এ খাতে মোট কর্মসংস্থান ১ লাখ ২১ হাজার কমেছে। অন্যদিকে আইন খাতে কর্মসংস্থান জুলাইয়ে আরও ১ হাজার বেড়ে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ২০০-তে পৌঁছেছে, যা এ খাতে রেকর্ড।
শ্রমবাজারের দুর্বলতার সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির গতিও কিছুটা কমেছে। জুলাইয়ে ঘণ্টাপ্রতি গড় মজুরি এক বছর আগের তুলনায় ৩.২ শতাংশ বেড়েছে। মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। ফলে চাকরির বাজার দুর্বল হলেও মূল্যস্ফীতি এখনো ফেডারেল রিজার্ভের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে।
জুলাইয়ের দুর্বল কর্মসংস্থান প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেপ্টেম্বরের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারের প্রত্যাশাতেও পরিবর্তন এসেছে। আর্থিক বাজারে সেপ্টেম্বরের সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এর আগে এ সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি ছিল। দুর্বল চাকরির তথ্যের ফলে বিনিয়োগকারীরা ফেডের কাছ থেকে অন্তত সাময়িকভাবে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে মূল্যস্ফীতি এখনো ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকায় সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত সহজ হবে না। জুনে ব্যক্তিগত ভোগব্যয় মূল্যসূচক বা পিসিই মূল্যস্ফীতি ৩.৭ শতাংশে ছিল। ফলে একদিকে শ্রমবাজার দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামেনি—এই দুই বিপরীত চাপের মধ্যে ফেডকে পরবর্তী নীতি নির্ধারণ করতে হবে।
ফেডারেল রিজার্ভের রিচমন্ড শাখার প্রেসিডেন্ট থমাস বারকিন জুলাইয়ের কর্মসংস্থান তথ্যকে সাম্প্রতিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, শ্রমবাজার বর্তমানে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে—নিয়োগদাতারা ব্যাপকভাবে নতুন কর্মী নিয়োগ করছেন না, আবার বড় আকারে কর্মী ছাঁটাইও করছেন না। এই পরিস্থিতি অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক বড় ধসের ইঙ্গিত না দিলেও নিয়োগের গতি যে বেশ মন্থর হয়েছে, তা স্পষ্ট।
এর প্রভাব মুদ্রাবাজারেও পড়েছে। জুলাইয়ের দুর্বল কর্মসংস্থান প্রতিবেদন প্রকাশের পর মার্কিন ডলারের দর প্রধান কয়েকটি মুদ্রার বিপরীতে কমেছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ফেডের ভবিষ্যৎ সুদের হার নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় ডলারে চাপ তৈরি হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে জুলাইয়ের কর্মসংস্থান প্রতিবেদন মার্কিন অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে এসেছে। চাকরি কমেছে, আগের মাসগুলোর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হিসাব নিচের দিকে সংশোধিত হয়েছে এবং শ্রমবাজারে মানুষের অংশগ্রহণও কমেছে। যদিও বেকারত্বের হার ৪.১ শতাংশে নেমেছে এবং স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ ও উৎপাদনসহ কিছু খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে, তবু সামগ্রিক নিয়োগের গতি দুর্বল হওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে এখন মূল নজর থাকবে আগামী মাসগুলোর কর্মসংস্থান, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ, মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ওপর। এসব সূচকের সম্মিলিত গতিপ্রকৃতিই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার সাময়িক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী মন্থরতার দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে এসব তথ্য ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সুদের হার সিদ্ধান্তেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।