নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
বিদেশে উচ্চশিক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া তথ্য ও নথির ব্যবহার এবং অনিয়মের অভিযোগ ঠেকাতে সরকারি প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও সরাসরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত সনদ অনলাইনে সত্যায়ন এবং নথি যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। এতে বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্ট সত্যায়নের ক্ষেত্রে আগে বিভিন্ন দপ্তরে সরাসরি যোগাযোগ করতে হতো। এ প্রক্রিয়ায় সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরতার সুযোগ তৈরি হতো। সেই জটিলতা কমাতে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের এটুআই উদ্যোগের মাধ্যমে ‘এপোস্টিল মাইগভ’ প্ল্যাটফর্মে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সনদ যুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সরকারের এ ব্যবস্থার আওতায় শিক্ষার্থী অনলাইনে আবেদন ও ফি পরিশোধ করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় সনদ ও একাডেমিক তথ্য যাচাই করে তা সত্যায়নের জন্য পরবর্তী সরকারি প্রক্রিয়ায় পাঠায়। ডিজিটালভাবে সত্যায়িত নথিতে কিউআর কোড যুক্ত থাকার ফলে সংশ্লিষ্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ নথির সত্যতা যাচাই করার সুযোগ পায়। এতে কাগজপত্র নিয়ে একাধিক দপ্তরে যাওয়ার প্রয়োজন কমে এবং নথি জালিয়াতির ঝুঁকিও কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। অতীতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও তাদের কার্যক্রম তদারকির জন্য সুস্পষ্ট কাঠামোর ঘাটতি ছিল। কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ, বৃত্তি, ভিসা ও চাকরির সম্ভাবনা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে সব পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত করা সমীচীন নয়; বৈধ ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানও শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও ভিসা প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।
বর্তমানে সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সুরক্ষা স্তর তৈরি করছে। বিশেষ করে শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই হওয়ায় ভুয়া সনদ বা পরিবর্তিত নথি ব্যবহার করে বিদেশে ভর্তি করানোর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার, টিউশন ফি, ভিসার শর্ত এবং অন্যান্য তথ্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের সরকারি ওয়েবসাইট থেকে যাচাই করার সুযোগও বাড়ছে।
বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এপোস্টিল কনভেনশনে যোগ দেয়। এর ফলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সরকারি নথি বিদেশে ব্যবহারের জন্য ডিজিটালভাবে সত্যায়নের ব্যবস্থা কার্যকর করার পথ তৈরি হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে এ ব্যবস্থাকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আন্তর্জাতিকমুখী করার পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য প্রক্রিয়াগত সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে বিদেশে পড়াশোনার পুরো প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর তথ্য ও নথি সরাসরি যাচাইযোগ্য করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে শুধু সনদ সত্যায়ন ডিজিটাল করলেই বিদেশে পড়াশোনার নামে সব ধরনের প্রতারণা বন্ধ হবে না। শিক্ষার্থী সংগ্রহ, ভর্তি আবেদন, অর্থ লেনদেন, ভিসা পরামর্শ এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর নিবন্ধন, অভিযোগ গ্রহণ, আর্থিক জবাবদিহি ও আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তের আগে তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়াই ন্যায়সংগত।
সরকারি উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে নিরাপদ ও স্বচ্ছ পথে নেওয়া। সরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ানো, সরাসরি তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রতারণার অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা গেলে বিদেশে পড়াশোনার বাজারে অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আর্থিক ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।