নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
দেশের জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বাজারব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি আমদানি এবং খুচরা পর্যায়ে বিক্রির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে জ্বালানি খাতের মতো কৌশলগত খাতে এ ধরনের উদ্যোগের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
সরকারের পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে জ্বালানি সরবরাহে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, আমদানির বিকল্প উৎস তৈরি এবং বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করার বিষয়টি সামনে আসছে। বর্তমানে দেশের জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেলের আমদানি, মজুদ, বিতরণ ও বিপণনে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা প্রধান কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তন সরাসরি দেশের জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে জ্বালানি মজুত ও আমদানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে চাপের কথা উঠে এসেছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে এবং নির্ধারিত নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় খুচরা বাজারে তা বিক্রি করতে পারবে—এমন ব্যবস্থার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এর ফলে একক আমদানি কাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বাজারে একাধিক সরবরাহকারী তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। অতীতেও সরকার বেসরকারি খাতের জন্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, পরিশোধন, মজুদ, বিতরণ ও বিপণন উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী আপত্তি জানিয়েছে। দলটির বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি খাতে মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। এর আগে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে দলটি কর্মসূচিও ঘোষণা করেছিল। জামায়াতের নেতারা জ্বালানি খাতে সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং বাজারে উচ্চমূল্যের বিষয়টি নিয়েও অভিযোগ করেছেন।
জ্বালানি তেলের বাজারে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি। আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও মান নিয়ন্ত্রণ, মজুদ সক্ষমতা, নিরাপত্তা, পরিবেশগত মান, কর ও শুল্ক পরিশোধ, বাজারে সরবরাহ এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি আমদানিকারকদের জন্য সমান ও স্বচ্ছ নীতিমালা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে সরকারি ও বেসরকারি আমদানিকারকদের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের শুল্কায়ন ব্যবস্থায় পার্থক্য নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি দেখা দিয়েছিল।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়লে বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে প্রতিযোগিতার নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী যাতে বাজারে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে জন্য শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন। জ্বালানি যেহেতু অর্থনীতি, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তাই আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
জামায়াতে ইসলামীর আপত্তির পাশাপাশি সরকারের পরিকল্পনার সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আমদানির সক্ষমতা বাড়তে পারে, অন্যদিকে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বাজারে মূল্য কারসাজি, মজুদ নিয়ন্ত্রণ বা অতিরিক্ত মুনাফার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই জ্বালানি আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়া হলে জনস্বার্থ, প্রতিযোগিতা, মূল্য স্থিতিশীলতা, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব—সবগুলো বিষয় বিবেচনায় রেখে নীতিমালা প্রণয়ন করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।