নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রার্থী বাছাই ও সুপারিশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) হাতে। সরকারের এ উদ্যোগের লক্ষ্য নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তি জোরদার করা এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাব কমানো।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপারিনটেনডেন্ট ও সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট পদে প্রার্থী বাছাই করে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবে এনটিআরসিএ। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মন্ত্রণালয় এ পদগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া স্থগিত করে ভবিষ্যতে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে পরিপত্রের চূড়ান্তকরণ নিয়ে সভা করে। মন্ত্রণালয়ের নথিতে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপার ও সহকারী সুপার পদে নিয়োগ সুপারিশের পদ্ধতি নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় এনটিআরসিএ ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের জন্য অষ্টম নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন করে। ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় লিখিত বা এমসিকিউ পরীক্ষা এবং পরে ফল প্রকাশ করা হয়। এনটিআরসিএর নিজস্ব ওয়েবসাইটেও অষ্টম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার সিলেবাস ও ফলাফলসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রক্রিয়াটির আওতায় বিপুলসংখ্যক শূন্য পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রতিষ্ঠানপ্রধানের মোট ১২ হাজার ৯৫১টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতেই ৯ হাজার ৭০৮টি পদ রয়েছে। এসব পদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন পদ রয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় নিয়োগপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে আসায় প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় পরিচালনা কমিটি বা গভর্নিং বডির সরাসরি প্রভাব কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক পরিচয়, স্থানীয় প্রভাব বা ব্যক্তিগত সুপারিশের পরিবর্তে যোগ্যতা ও পরীক্ষার ফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কাঠামো তৈরি হতে পারে। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে পরীক্ষা, মৌখিক মূল্যায়ন, প্রার্থী যাচাই এবং চূড়ান্ত সুপারিশের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।
এনটিআরসিএ মূলত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও প্রত্যয়ন ব্যবস্থা পরিচালনা করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান উন্নয়নে যোগ্য শিক্ষক নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
শিক্ষাবিদদের দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক নেতৃত্বে যোগ্য ব্যক্তিদের আসার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য, স্বজনপ্রীতি বা অযাচিত প্রভাবের অভিযোগ কমাতে হলে প্রার্থীদের মূল্যায়নের মানদণ্ড, পরীক্ষার ফল, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর এবং সুপারিশের কারণ যথাসম্ভব স্বচ্ছ রাখা প্রয়োজন।
তবে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএর হাতে যাওয়াই রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার নিশ্চয়তা নয়। নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে নিরপেক্ষতা, অভিন্ন মানদণ্ড, পরীক্ষার নিরাপত্তা, প্রার্থী যাচাই এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে যোগ্য প্রার্থীদের ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে দীর্ঘদিনের স্থানীয় প্রভাব ও সুপারিশনির্ভরতার অভিযোগ কতটা কমে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও শিক্ষার্থীবান্ধব মানসিকতাকে অগ্রাধিকার দিতে পারলে নতুন নিয়োগব্যবস্থা শিক্ষা প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।