জাতীয়

ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে বাড়ছে উত্তেজনা

ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে বাড়ছে উত্তেজনা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ও কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই পক্ষের বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। এসব ঘটনায় আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও শিক্ষার পরিবেশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে গত ২১ এপ্রিল ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ও কলেজ সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাম্পাসের একটি দেয়াললিখনকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। পরে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে শিবিরবিরোধী কর্মসূচি পালন করে।

চট্টগ্রামের ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাল্টাপাল্টি দেয়াললিখন ও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি আবাসিক হলেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান ও বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি হলের প্রাধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেন।

পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজেও দুই সংগঠনের পাল্টাপাল্টি মিছিলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়। ২৩ এপ্রিল সকালে কলেজ ক্যাম্পাসে দুই পক্ষের কর্মসূচি চলার সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় ছাত্রদলের একটি অস্থায়ী কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে সংঘর্ষের সূত্রপাত নিয়ে দুই পক্ষ পরস্পরকে দায়ী করেছে। ঈশ্বরদী থানার পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও তখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেয়নি।

এর পরদিন কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন আহত হন। পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা যায়, একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে অধ্যক্ষের কক্ষে আলোচনা চলার সময় উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং প্রশাসন ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায়।

রাজধানীতেও একই সময়ে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই সংগঠনের বিরোধের খবর পাওয়া গেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক দিনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক এসব ঘটনার বাইরে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ও রাকসুর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। যদিও ঘটনাটি সরাসরি ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ নয়, এতে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ঘিরে উত্তেজনার আরেকটি চিত্র সামনে এসেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যও পাওয়া গেছে।

ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য গণতান্ত্রিকভাবে প্রকাশের সুযোগ থাকলেও সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা শিক্ষার পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে দেয়াললিখন, মিছিল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধ যেন শারীরিক সংঘাতে না গড়ায়, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কোনো সংঘর্ষের ঘটনায় দায় নির্ধারণের আগে প্রত্যক্ষদর্শী, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষার্থীকে দোষী সাব্যস্ত না করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নির্ধারণ এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন ও প্রতিষ্ঠানের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই শিক্ষাঙ্গনে নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখার পথ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞানচর্চা ও মতপ্রকাশের জায়গা। রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও তা যেন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষা কার্যক্রম ও মতপ্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, রাজনৈতিক সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সবার।