সোহেল আহমেদ, শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
একসঙ্গে বেশি মানুষ উঠলেই দুলতে থাকে কাঠের পুলটি। নড়বড়ে পাটাতন আর দুর্বল কাঠামোর কারণে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ঝুঁকি এড়াতে পুলের দুই প্রান্তে অপেক্ষা করতে হয় পারাপার হতে আসা মানুষকে। অথচ বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পুল পার হচ্ছেন শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষ। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও নির্মিত হয়নি স্থায়ী পাকা সেতু। ফলে দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা ও খোন্তাকাটা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের।
সেতু ভেঙে যাওয়ার পর ভরসা কাঠের পুল
সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলা উপজেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র রায়েন্দা বাজার। বাজারসংলগ্ন রায়েন্দা খালের ওপর একসময় ছিল একটি আরসিসি সেতু। ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট সকালে সেতুটি ধসে পড়ে। এতে খালের দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় চরম বিপর্যয় দেখা দেয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পরবর্তী সময়ে কিছুটা দূরে দুই ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে নির্মাণ করা হয় একটি অস্থায়ী কাঠের পুল। শুরুতে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে এটি মানুষের উপকারে এলেও দীর্ঘদিন ব্যবহারে এখন সেটিও জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
নতুন সেতু নির্মিত না হওয়ায় অস্থায়ী এই পুলই এখন দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ভরসা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
১১ কোটি টাকার সেতু প্রকল্প থমকে যায়
উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পুরোনো সেতুটি ধসে পড়ার পর সেখানে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গ্রামীণ সহায়তা সেতু প্রকল্পের আওতায় ৭৪ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১১ কোটি টাকা।
মাটি পরীক্ষা, নকশা প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। তবে সরকার পরিবর্তন ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটির কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে পাঁচ বছর ধরে স্থায়ী সেতুর অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কবে নাগাদ নির্মাণকাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় অনিশ্চয়তা কাটছে না।
জরাজীর্ণ পুলে দুর্ঘটনার শঙ্কা
সরেজমিনে দেখা যায়, রায়েন্দা খালের ওপর নির্মিত কাঠের পুলটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দীর্ঘদিনের ব্যবহার ও আবহাওয়ার প্রভাবে এর বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। রেলিংয়ের কিছু অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় চলাচলের সময় ভারসাম্য রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
একসঙ্গে বেশি মানুষ পুলের ওপর উঠলে সেটি দুলতে থাকে। ঝুঁকি কমাতে পুলের মাঝামাঝি দুই পাশে নারকেলগাছ পুঁতে সহায়ক ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু রোদ-বৃষ্টিতে সেগুলোও পচে ও ভেঙে গেছে। এতে পুলটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কাদা ও পানিতে কাঠের পাটাতন পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় পারাপারে ভোগান্তি বাড়ে। তবু প্রয়োজনের তাগিদে প্রতিদিন শিশু, শিক্ষার্থী, নারী, বয়স্ক ও সাধারণ মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে পুলটি পার হতে হচ্ছে।
দুই পাড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ
রায়েন্দা খালের দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্র রায়েন্দা বাজার। এখানে দুই হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে সরকারি হাসপাতাল, থানা, পোস্ট অফিস, ছয়টি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাঁচটি ব্যাংকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
অন্যদিকে খালের উত্তর পাড়ে রয়েছে শরণখোলা সরকারি ডিগ্রি কলেজ, একটি ফাজিল মাদরাসা, তিনটি বরফকল, একটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং দুই শতাধিক দোকানপাট।
দুই পাড়ের এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাকেন্দ্রের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম কাঠের পুলটি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় যাতায়াত করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পুলটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে জরুরি রোগী পরিবহন ও ভারী মালামাল আনা-নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শিক্ষার্থীদের নিত্যসঙ্গী দুর্ঘটনার আতঙ্ক
স্থানীয় শিক্ষার্থীরা জানায়, পুলের ওপর উঠলেই সেটি কাঁপতে থাকে। একসঙ্গে অনেক মানুষ পারাপারের চেষ্টা করলে নিরাপত্তার স্বার্থে এক পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে দেরি হয়। বর্ষাকালে পিচ্ছিল পাটাতনের কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে পুল পার হতে হয়। যেকোনো সময় এটি ভেঙে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত রায়েন্দা খালের ওপর পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছে তারা।
ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব
রায়েন্দা বাজারের ব্যবসায়ী শহিদল ইসলাম, সরোয়ার হোসেন ও খোকন শিকদারসহ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কাঠের পুলটি দিয়ে ভারী মালামাল পরিবহন করা যায় না। পুলের নড়বড়ে অবস্থা এবং সীমিত চলাচলব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
তাঁরা বলেন, প্রায় এক বছর আগে নতুন পাকা সেতু নির্মাণের কথা শুনেছিলেন। কিন্তু সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিতে দিতে পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা ও সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে দ্রুত একটি স্থায়ী পাকা সেতু নির্মাণ করা জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদেরও দ্রুত সেতু নির্মাণের দাবি
শরণখোলার রায়েন্দা-রাজৈর ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ আব্দুল জলিল আনোয়ারী এবং রায়েন্দা সরকারি পাইলট হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল হালিম বলেন, কাঠের পুলটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। প্রতিদিন কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে ঝুঁকি নিয়ে এ পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের এভাবে ঝুঁকির মধ্যে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দ্রুত পাকা সেতু নির্মাণ করা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও জনদুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রকৌশল বিভাগের আশ্বাস, অপেক্ষা বরাদ্দের
এ বিষয়ে শরণখোলা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ভারপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন কিছু জটিলতার কারণে সেতু প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। বিষয়টি তখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে আবার যোগাযোগ করা হলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।
আর আশ্বাস নয়, দ্রুত বাস্তবায়ন চান এলাকাবাসী
একটি সেতুর অভাবে পাঁচ বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শরণখোলার দুই ইউনিয়নের মানুষ। ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের পুলটি শুধু দুর্বল যোগাযোগ অবকাঠামোর প্রতীক নয়, প্রতিদিন হাজারো মানুষের নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রকল্পটির অগ্রগতি নিশ্চিত করবে এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে পাকা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করবে। পাশাপাশি স্থায়ী সেতু নির্মাণের আগ পর্যন্ত মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে জরুরি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তাঁদের দাবি, আর আশ্বাস নয়—এবার প্রয়োজন দৃশ্যমান উদ্যোগ ও কার্যকর বাস্তবায়ন।




