নিজস্ব প্রতিবেদক
জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাবনা বাড়লেও দেশটিতে যাওয়ার আগে দক্ষতা উন্নয়ন, জাপানি ভাষা শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী বা স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডব্লিউ) কর্মসূচির আওতায় জাপানে যেতে হলে শুধু বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ যথেষ্ট নয়; নির্ধারিত কাজের দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা এবং প্রাক্-প্রস্থান প্রস্তুতি সম্পন্ন করাকেই কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাপানে জনবল সংকট ক্রমেই তীব্র হওয়ায় দেশটি বিদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার আরও বিস্তৃত করছে। ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে এসএসডব্লিউ কর্মসূচির ১৬টি খাতে ৮ লাখ ২০ হাজার বিদেশি কর্মী নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে জাপান সরকার। বাংলাদেশ সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারলে এই চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রত্যাশা রয়েছে।
এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশও দক্ষ কর্মী তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জাপানে পাঠানোর আগে কর্মীদের পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, জাপানি ভাষা এবং দেশটির কর্মপরিবেশ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ-টু-জাপান উদ্যোগের তথ্য অনুযায়ী, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি), বিভিন্ন প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং দেশের প্রায় ২০০টি বেসরকারি জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আগ্রহীরা ভাষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।
জাপানে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভাষাগত সক্ষমতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রে নির্দেশনা বোঝা, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ এবং দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার জন্য জাপানি ভাষা জানা প্রয়োজন। এ কারণে শুধু কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে একজন কর্মীকে জাপানে পাঠানো হলে তাঁর কর্মক্ষেত্রে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। ভাষা ও পেশাগত দক্ষতার সমন্বিত প্রস্তুতি তাই অভিবাসনের সফলতার অন্যতম ভিত্তি।
সরকারও জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। চলতি বছরের মার্চে সরকারি পর্যায়ের আলোচনায় পর্যায়ক্রমে সব কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে জাপানি ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু এবং স্থানীয় পর্যায়ে জাপানি ভাষার প্রশিক্ষক নিয়োগের বিষয় উঠে আসে। সরাসরি প্রশিক্ষকের পাশাপাশি ভার্চুয়াল শিক্ষাদান প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এর আগে মার্চে বাংলাদেশে জাপানের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বৈঠকেও জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানোর মাধ্যমে বাংলাদেশিদের জাপানে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়, জাপানে যাওয়ার প্রস্তুতি শুধু ভিসা বা নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভাষা, সংস্কৃতি ও কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের দিকে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জাপানে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাক্-প্রস্থান প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউএন উইমেনের উদ্যোগে বাংলাদেশে জাপানগামী কর্মীদের জন্য যে প্রাক্-প্রস্থান প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা হয়েছিল, তাতে অভিবাসন প্রক্রিয়া, জাপানে যাওয়ার প্রস্তুতি, পেশাভিত্তিক নির্দেশনা, দেশভিত্তিক তথ্য, কর্মীদের অধিকার এবং জীবনদক্ষতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ওই মডিউলটি এমন কর্মীদের জন্য তৈরি, যারা এর আগে সংশ্লিষ্ট কারিগরি ও জাপানি ভাষার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন।
এতে একটি বিষয় পরিষ্কার—প্রাক্-প্রস্থান ওরিয়েন্টেশন কোনো পেশাগত প্রশিক্ষণের বিকল্প নয়। একজন কর্মীকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট কাজের বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে হবে, এরপর জাপানি ভাষা ও কর্মক্ষেত্রের যোগাযোগে সক্ষম হতে হবে এবং সবশেষে দেশটির জীবনযাপন, আইন, অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে যথাযথ ধারণা নিয়ে বিদেশে যেতে হবে।
বাংলাদেশের ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মেও বিদেশগামী কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণকে অভিবাসন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির তথ্যে দেখা যায়, বিএমইটির মাধ্যমে নিবন্ধন, টিটিসি বা ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজির মাধ্যমে দক্ষতা প্রশিক্ষণ, প্রাক্-প্রস্থান ওরিয়েন্টেশন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসা এবং ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স—ধাপে ধাপে বিদেশগমন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাঠামো রয়েছে।
জাপানের ক্ষেত্রে পেশাভেদে দক্ষতার প্রয়োজনও আলাদা। নির্মাণ, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পরিচর্যা, ভবন পরিষ্কার, শিল্প উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে কাজের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। ফলে একজন কর্মী কোন খাতে জাপানে যাবেন, সেই সিদ্ধান্তের পর থেকেই তাঁর প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা নির্ধারণ করা জরুরি।
বিশেষ করে এসএসডব্লিউ কর্মসূচির ক্ষেত্রে দক্ষতা পরীক্ষার পাশাপাশি জাপানি ভাষার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-টু-জাপান উদ্যোগে জাপানে কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য টেকনিক্যাল অ্যান্ড ট্রেডস ল্যাংগুয়েজ সার্টিফিকেশন এবং জাপানে স্বীকৃত দক্ষতা সনদের সুযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু ভাষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই যে কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়া যাবে, এমনটিও নয়। জাপানের কর্মসংস্কৃতিতে সময়ানুবর্তিতা, নিয়ম মেনে কাজ করা, নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ, দলগতভাবে কাজ করা এবং দায়িত্বশীল আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীদের এসব বিষয় আগে থেকেই জানানো গেলে বিদেশে গিয়ে সাংস্কৃতিক ও কর্মক্ষেত্রের পার্থক্যজনিত সমস্যাও কমানো সম্ভব।
এখানে প্রশিক্ষণের মান নিয়ে প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যে যদি প্রশিক্ষণের সময় কমিয়ে দেওয়া হয় বা কেবল সনদ পাওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাহলে জাপানের নিয়োগদাতাদের কাছে বাংলাদেশি কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রশিক্ষণের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণের গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি।
সরকারের সামনে এখন বড় সুযোগ হলো জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদাকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। শুধু জাপানে পাঠানোর জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ নয়, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে ব্যবহারযোগ্য দক্ষতা তৈরি করতে পারলে একজন কর্মী ভবিষ্যতে অন্য দেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে টিটিসিগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ প্রশিক্ষক, জাপানি ভাষার শিক্ষক, পেশাভিত্তিক ল্যাবরেটরি এবং বাস্তব কর্মপরিবেশের মতো প্রশিক্ষণ সুবিধা থাকলে বিদেশগামী কর্মীদের প্রস্তুতি আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে কর্মীদের দক্ষতা যাচাই এবং সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও নিশ্চিত করা দরকার।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দালালনির্ভর অভিবাসন। জাপানে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে কেউ যেন অতিরিক্ত অর্থ দাবি করতে না পারে কিংবা ভুয়া চাকরি ও ভিসার প্রলোভন দেখাতে না পারে, সে বিষয়ে কর্মীদের সচেতন করা প্রয়োজন। সরকারি প্ল্যাটফর্ম ও নিবন্ধিত প্রশিক্ষণ ও নিয়োগব্যবস্থা ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে প্রতারণার ঝুঁকি কমতে পারে।
জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা যে বাড়ছে, সাম্প্রতিক সরকারি উদ্যোগগুলোতেও তার প্রতিফলন রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলেই সরকার জাপানের এসএসডব্লিউ কর্মসূচির ১৬টি খাতে বিপুলসংখ্যক দক্ষ কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে কর্মীদের শুধু সংখ্যায় নয়, মানে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে হবে।
দক্ষতা উন্নয়নের এই প্রস্তুতির সঙ্গে কর্মীদের অধিকার সম্পর্কেও ধারণা দিতে হবে। নিয়োগ চুক্তিতে বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, বাসস্থান, চিকিৎসা, বীমা, চুক্তির মেয়াদ এবং দেশে ফেরার নিয়ম কী—এসব তথ্য কর্মীকে দেশ ছাড়ার আগেই বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। এতে বিদেশে গিয়ে ভুল বোঝাবুঝি ও শোষণের ঝুঁকি কমবে।
একই সঙ্গে জাপানে যাওয়ার পরও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রবাসী কর্মীরা সমস্যায় পড়লে কোথায় যোগাযোগ করবেন, দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা কীভাবে পাবেন এবং কর্মক্ষেত্রে অধিকার লঙ্ঘিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়—এসব বিষয়ে প্রাক্-প্রস্থান প্রশিক্ষণে বাস্তবভিত্তিক নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে জাপানের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে টেকসইভাবে প্রবেশ করতে হলে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন হবে দক্ষতা, ভাষা, কর্মসংস্কৃতি, নিরাপত্তা, অধিকার ও বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্পর্কে সমন্বিত প্রস্তুতি।
জাপানে যাওয়ার আগে দক্ষতা উন্নয়ন তাই কোনো অতিরিক্ত প্রস্তুতি নয়; এটি একজন কর্মীর নিরাপদ ও টেকসই বিদেশযাত্রার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশ যদি মানসম্মত প্রশিক্ষণ, জাপানি ভাষা শিক্ষা এবং স্বচ্ছ অভিবাসনব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে পারে, তাহলে জাপানের ক্রমবর্ধমান শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।