বিশেষ সংবাদ

চবির সিনেট সভা আজ

চবির সিনেট সভা আজ

চুয়েট প্রতিনিধি:

দীর্ঘ তিন বছর পর আজ শনিবার (৮ আগস্ট) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ৩৬তম সিনেট অধিবেশন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ এই অধিবেশনে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রাক্কলিত রাজস্ব বাজেট এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব বাজেট উপস্থাপন ও অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল ফোরকান।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত রাজস্ব বাজেটের আকার ৫০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব বাজেট ধরা হয়েছে ৪৮৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। সিনেট অধিবেশনে এসব আর্থিক প্রস্তাব উপস্থাপনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি অনুযায়ী তা নিয়ে আলোচনা ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এবারের সিনেট সভার গুরুত্ব শুধু বাজেট অনুমোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত সিনেট অধিবেশন না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আইনগত ও বিধিবদ্ধ বিষয় অনুমোদন ও পর্যালোচনার অপেক্ষায় রয়েছে। তিন বছর পর সিনেটের আনুষ্ঠানিক অধিবেশন বসায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী সিনেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনগত সংস্থা। আইন অনুযায়ী সিনেটকে অন্তত বছরে একবার সভা করার কথা বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন, বার্ষিক হিসাব ও আর্থিক প্রাক্কলন অনুমোদন, সিন্ডিকেটের সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংবিধি সংশোধন ও অনুমোদন এবং আইন দ্বারা অর্পিত অন্যান্য দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সিনেটের কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত।

কিন্তু ২০২৩ সালের ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর পরবর্তী তিন বছরে আর কোনো সিনেট সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে নিয়মিত আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন এমন কিছু বিধিবদ্ধ বিষয়ও দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল। এবারের অধিবেশনের মাধ্যমে সেই দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে মোট ১০২ জন সদস্য রয়েছেন। তাঁরা ১২টি শ্রেণি বা প্রতিনিধিত্বমূলক ক্যাটাগরি থেকে আসেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্য, সরকারের মনোনীত প্রতিনিধি, স্পিকারের মনোনীত সংসদ সদস্য, চ্যান্সেলরের মনোনীত শিক্ষাবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, অধিভুক্ত ও সংযুক্ত কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষক, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, নির্বাচিত নিবন্ধিত গ্র্যাজুয়েট, নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

এই প্রতিনিধিত্ব কাঠামোর কারণে সিনেট অধিবেশনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর অংশীজনদের অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গ্র্যাজুয়েট, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিনিধিত্বের সমন্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সুযোগ থাকে।

এবারের সভায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হবে প্রস্তাবিত রাজস্ব বাজেট। ৫০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদিত হলে আগামী অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, প্রশাসন, অবকাঠামো, গবেষণা ও অন্যান্য রাজস্ব কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থ ব্যবস্থাপনার একটি নতুন কাঠামো কার্যকর হবে। একই সঙ্গে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের অনুমোদন বিশ্ববিদ্যালয়ের চলতি অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাবকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের আওতায় আনবে।

তবে বাজেটের আকার বাড়লেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না। বরাদ্দের অর্থ কোন খাতে কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাডেমিক প্রয়োজন কতটা পূরণ হচ্ছে, গবেষণায় বিনিয়োগ কতটা বাড়ছে এবং অবকাঠামোগত সংকট কতটা কমছে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সিনেটের আলোচনায় বাজেটের পাশাপাশি এসব বাস্তব বিষয় গুরুত্ব পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক পরিকল্পনা আরও কার্যকর হতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নোটিশগুলোতেও গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতের বাজেট বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে পরিচালনার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের গবেষণা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে অংশগ্রহণের বিষয়েও নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

ফলে এবারের সিনেট অধিবেশনে শুধু রাজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রমের জন্য অর্থের ব্যবহার নিয়েও বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। উচ্চশিক্ষার মান বাড়াতে গবেষণা, ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তায় বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

তিন বছর পর সিনেট সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। আইন অনুযায়ী নিয়মিত সভার বিধান থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় অধিবেশন না হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত কাঠামো কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। এখন নিয়মিত বার্ষিক অধিবেশন অব্যাহত রাখার মাধ্যমে সেই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সিনেটের কার্যক্রম কার্যকর রাখতে সভা নিয়মিত হওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি সভায় উপস্থাপিত আর্থিক ও প্রশাসনিক তথ্য সদস্যদের কাছে যথাসময়ে এবং স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করাও জরুরি। কারণ সিনেট শুধু আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক জবাবদিহিতা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের সামনে তাই এবারের সিনেট অধিবেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ। দীর্ঘ বিরতির পর সভাটি কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন প্রতিবছর নির্ধারিত সময়ে সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, সেই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সিনেটের নিয়মিত কার্যক্রম চালু থাকা শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত ও গণতান্ত্রিক কাঠামো কার্যকর রাখার অংশ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গ্র্যাজুয়েট ও অন্যান্য প্রতিনিধির অংশগ্রহণে বাজেট ও নীতিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের ভূমিকা আরও সুস্পষ্ট হয়।

সব মিলিয়ে তিন বছর পর আজকের ৩৬তম সিনেট অধিবেশন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ঘটনা। ৫০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের রাজস্ব বাজেট, ৪৮৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকার সংশোধিত ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেট এবং দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন বিধিবদ্ধ বিষয়গুলোকে ঘিরে অধিবেশনে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘ বিরতির পর এই সভা শুধু একটি বাজেট অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত আইনগত কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের সূচনা হোক—এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।