বিনোদন

ছায়ানটে ‘শ্যামা’, প্রয়াণদিবসে রবীন্দ্রস্মরণ

ছায়ানটে ‘শ্যামা’, প্রয়াণদিবসে রবীন্দ্রস্মরণ

বিনোদন প্রতিবেদক:

কবিগুরুর সৃষ্টির মায়াময় জগৎ যেন আবারও মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠতে চলেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে ছায়ানটের আয়োজনে মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে তাঁর কালজয়ী নৃত্যনাট্য ‘শ্যামা’। প্রেম, আত্মত্যাগ, অপরাধবোধ, ক্ষমা ও মানবিকতার জটিল টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই নৃত্যনাট্যের মধ্য দিয়ে কবিগুরুকে স্মরণ করবে দেশের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকে শুধু পাঠ বা গানের পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে মঞ্চ, নৃত্য, সংগীত ও অভিনয়ের সম্মিলিত প্রকাশে দর্শকের সামনে তুলে ধরার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে ছায়ানটের। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও প্রয়াণ—দুই উপলক্ষকেই তারা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করে আসছে। বর্তমানে ২৫ বৈশাখে দুই দিনের রবীন্দ্র-উৎসব এবং ২২ শ্রাবণের প্রয়াণবার্ষিকীতে গানে-পাঠে একদিনের স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

এবার সেই স্মরণপর্বে ‘শ্যামা’র মতো একটি নৃত্যনাট্য বেছে নেওয়ার তাৎপর্যও আলাদা। রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামা’ শুধু প্রেমের গল্প নয়; এর ভেতরে রয়েছে মানুষের সিদ্ধান্ত, অপরাধের দায়, ভালোবাসার আকুলতা এবং আত্মত্যাগের গভীর মনস্তত্ত্ব। রাজসভা, প্রেম ও নৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যাওয়া কাহিনিতে একপর্যায়ে ব্যক্তিগত ভালোবাসা মানুষের বিবেক ও ন্যায়বোধের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

‘শ্যামা’র কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্যামা একদিকে প্রেমের আকর্ষণে আবদ্ধ, অন্যদিকে প্রিয় মানুষকে রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষায় এমন এক সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যায়, যার পরিণতি তাকে গভীর অনুশোচনার মুখোমুখি করে। বজ্রসেন, উত্তীয়সহ অন্যান্য চরিত্রের উপস্থিতিতে কাহিনি ক্রমে হয়ে ওঠে প্রেম, ত্যাগ ও নৈতিকতার এক জটিল নাট্যভাষ্য। এই বহুমাত্রিকতাই ‘শ্যামা’কে রবীন্দ্রনাথের গুরুত্বপূর্ণ নৃত্যনাট্যগুলোর একটি করে তুলেছে।

ছায়ানটের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কও দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের। প্রতিষ্ঠানটির জন্মই হয়েছিল ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনের সূত্র ধরে গড়ে ওঠা একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল ইসলামের দেশভাবনা ও সৃষ্টিকে অবলম্বন করে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয়েছে।

এই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্র-প্রয়াণদিবসের আয়োজন ছায়ানটের জন্য কেবল আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয়; বরং কবিগুরুর সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে পৌঁছে দেওয়ার একটি সাংস্কৃতিক প্রয়াস। মঞ্চে নৃত্য, সংগীত ও অভিনয়ের সমন্বয়ে ‘শ্যামা’ পরিবেশিত হলে দর্শক রবীন্দ্রসাহিত্যের একটি বহুল আলোচিত রচনাকে ভিন্ন শিল্পভাষায় অনুভব করার সুযোগ পাবেন।

২০২৬ সালেও ছায়ানট রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দুই দিনের রবীন্দ্র-উৎসব আয়োজন করেছে। ৮ ও ৯ মে অনুষ্ঠিত ওই উৎসব ছিল কবিগুরুর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে। উৎসবের সূচনা হয়েছিল ‘ভুবনজোড়া আসনখানি’ সম্মেলক নৃত্যগীত দিয়ে। পরে ছায়ানট পরিবেশন করে ‘কেন এ হিংসাদ্বেষ’ শীর্ষক গীতিনৃত্যালেখ্য। দুই দিনের আয়োজনে একক ও সম্মেলক গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশিত হয়; অংশ নেন ছায়ানটের শিল্পীদের পাশাপাশি অতিথি শিল্পী ও দল।

রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী ঘিরে এবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে ছায়ানট আবারও দেখিয়েছে, কবিগুরুর সৃষ্টিকে সমকালীন সাংস্কৃতিক পরিসরে সক্রিয় রাখার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। ‘শ্যামা’ মঞ্চস্থের উদ্যোগও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

‘শ্যামা’র সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানবিক প্রশ্নে। ভালোবাসার জন্য মানুষ কতদূর যেতে পারে, প্রিয়জনকে রক্ষার নামে অন্যায়ের আশ্রয় নেওয়া যায় কি না, অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব কি না—এমন বহু প্রশ্ন নৃত্যনাট্যটির কাহিনির ভেতর দিয়ে সামনে আসে। ফলে শত বছর পেরিয়েও এর আবেগ ও নৈতিক দ্বন্দ্ব সমকালীন দর্শকের কাছে অচেনা নয়।

বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন ব্যক্তি-স্বার্থ, ক্ষমতা, সম্পর্ক ও নৈতিকতার সংঘাত মানুষের ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে নানা প্রশ্ন তৈরি করছে, তখন ‘শ্যামা’র মতো একটি রচনার মঞ্চায়ন নতুন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথের ভাষা ও সুরের সঙ্গে নৃত্যের শরীরী অভিব্যক্তি যুক্ত হলে চরিত্রগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্ব আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

ছায়ানটের আয়োজনে এমন পরিবেশনা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রবীন্দ্রনাথকে শুধু জন্মদিন বা প্রয়াণদিবসের আনুষ্ঠানিক স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর নাট্য, নৃত্যনাট্য, গান, কবিতা ও দর্শনকে মঞ্চে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে নতুন দর্শক তৈরি করা সম্ভব। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রসৃষ্টির সঙ্গে পরিচয়ের একটি জীবন্ত পথ হয়ে উঠতে পারে এ ধরনের আয়োজন।

তবে ২০২৬ সালের ছায়ানটের প্রকাশিত অনলাইন অনুষ্ঠানতালিকায় বর্তমানে ‘শ্যামা’র নির্দিষ্ট মঞ্চায়নের তারিখ, সময়, স্থান এবং অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশিত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে না। ছায়ানটের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২২ শ্রাবণের প্রয়াণবার্ষিকী তাদের নিয়মিত স্মরণানুষ্ঠানের অংশ। তাই মঞ্চায়নের চূড়ান্ত সময়সূচি ও শিল্পীদের নাম আয়োজকদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সঙ্গে মিলিয়ে প্রকাশ করাই যথাযথ হবে।

সব মিলিয়ে, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণকে ঘিরে ‘শ্যামা’র মঞ্চায়ন হলে তা হয়ে উঠতে পারে স্মরণ, শিল্প ও আত্মঅনুসন্ধানের এক সম্মিলিত আয়োজন। মঞ্চে শ্যামার প্রেম, বজ্রসেনের নিয়তি আর উত্তীয়ের আত্মত্যাগ যখন নৃত্য ও সংগীতের ভাষায় ফুটে উঠবে, তখন কবিগুরুর সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোই হয়তো নতুন করে দর্শকের সামনে ফিরে আসবে—ভালোবাসার মূল্য কত, ক্ষমার সীমা কোথায়, আর মানুষের বিবেকের কাছে শেষ পর্যন্ত দায়বদ্ধতা কার?