বিনোদন প্রতিবেদক:
গানের মঞ্চে শিল্পীর কণ্ঠে যখন একের পর এক জনপ্রিয় গান, তখন দর্শকের উচ্ছ্বাসই হওয়ার কথা ছিল সেই আয়োজনের প্রাণ। কিন্তু আর্কের কণ্ঠশিল্পী হাসানের একটি কনসার্টে দর্শকসারি থেকে মঞ্চের দিকে বোতল নিক্ষেপের ঘটনায় সেই আনন্দঘন পরিবেশ নিয়ে তৈরি হয়েছে সমালোচনা। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার পাশাপাশি আয়োজকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কনসার্টে দর্শকদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্টদের ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন অনেকে।
হাসান বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের নব্বইয়ের দশকের অন্যতম পরিচিত কণ্ঠ। আর্কের সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে। ‘সুইটি’, ‘ভুলে গেছি’, ‘যারে যা’, ‘বাংলাদেশ’, ‘দূরে বহু দূরে’সহ একাধিক গান তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পরিচিত করে তোলে। ২০১০ সালে দীর্ঘ বিরতির পর তিনি আবার আর্কে ফিরে মঞ্চে নিয়মিত গান পরিবেশন শুরু করেন।
কনসার্টে বোতল নিক্ষেপের মতো ঘটনা তাই শুধু একজন শিল্পীর প্রতি অসম্মান হিসেবে নয়, সামগ্রিকভাবে সংগীতচর্চা ও দর্শকসংস্কৃতির জন্যও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। একটি কনসার্টে শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার দায়িত্ব উভয় পক্ষের। দর্শকের উচ্ছ্বাস কোনোভাবেই এমন আচরণে পরিণত হওয়া উচিত নয়, যাতে শিল্পী, সহশিল্পী, আয়োজক কিংবা অন্য দর্শকের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে।
বিশেষ করে মঞ্চের দিকে বোতল বা অন্য কোনো বস্তু ছুড়ে দেওয়া বিপজ্জনক। লক্ষ্যভ্রষ্ট বস্তু মঞ্চে থাকা শিল্পী বা বাদ্যযন্ত্রে আঘাত করতে পারে, আবার দর্শকদের মধ্যেও আতঙ্ক বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। বড় কনসার্টে এ ধরনের একটি ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলায় রূপ নিতে পারে। অতীতে বাংলাদেশে কনসার্টে মঞ্চের দিকে বোতল নিক্ষেপের ঘটনায় দর্শকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৫ সালে হবিগঞ্জে একটি কনসার্টে স্টেজের দিকে বোতল নিক্ষেপের পর বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন।
হাসানের সাম্প্রতিক মঞ্চযাত্রার প্রতি দর্শকদের আগ্রহও কম নয়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালের বিজয় দিবসে ‘শবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টের মাধ্যমে তাঁর মঞ্চে প্রত্যাবর্তন ব্যাপক সাড়া ফেলে। সে সময় তাঁর পরিবেশনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরোনো শ্রোতাদের মধ্যে তৈরি হয় নস্টালজিয়া।
এরপর বিভিন্ন কনসার্টে হাসান ও আর্কের গান নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ২০২২ সালের ‘মিxtape Vol I’ কনসার্টে আর্ক মঞ্চে ওঠার পর দর্শকদের ব্যাপক উচ্ছ্বাসের কথা জানিয়েছিল দ্য ডেইলি স্টার। ওই অনুষ্ঠানে হাসানের পরিবেশনায় ‘প্রতিশ্রুতি’, ‘সুইটি’, ‘এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়’সহ একাধিক গান পরিবেশিত হয় এবং অনুষ্ঠান শেষ হয় ‘যারে যা’ গান দিয়ে।
এই দীর্ঘ সংগীতযাত্রার প্রেক্ষাপটে মঞ্চে বোতল নিক্ষেপের মতো আচরণ স্বাভাবিকভাবেই শিল্পী ও সংগীতপ্রেমীদের কাছে হতাশাজনক। একটি শিল্পীর সঙ্গে মতবিরোধ, কোনো পরিবেশনা পছন্দ না হওয়া কিংবা ব্যক্তিগত অসন্তোষ থাকলেও তার প্রকাশের গ্রহণযোগ্য পথ রয়েছে। মঞ্চে বস্তু নিক্ষেপ সেই গ্রহণযোগ্যতার সীমা অতিক্রম করে এবং শিল্পীর শারীরিক নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় অনেকেই সংশ্লিষ্ট দর্শক বা আয়োজকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কারা বোতল নিক্ষেপ করেছেন, কী কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটনার পর আয়োজকরা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত না হওয়ায় ঘটনার দায় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর চাপানোও সমীচীন নয়।
তবে ঘটনার সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাই হোক, কনসার্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। প্রবেশপথে নিরাপত্তা তল্লাশি, নিষিদ্ধ বস্তু নিয়ন্ত্রণ, দর্শকসারিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী রাখা এবং মঞ্চের দিকে কোনো বস্তু নিক্ষেপ হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া—বড় আয়োজনগুলোতে এসব বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে দর্শকদের মধ্যেও কনসার্ট সংস্কৃতি সম্পর্কে দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে। শিল্পীর পরিবেশনা পছন্দ না হলে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করা, আয়োজকদের জানানো কিংবা অন্য কোনো শান্তিপূর্ণ উপায়ে আপত্তি জানানো সম্ভব। কিন্তু বোতল, চেয়ার বা অন্য কোনো বস্তু ছুড়ে প্রতিবাদ করা কখনোই গ্রহণযোগ্য আচরণ হতে পারে না।
হাসান ও আর্কের সংগীত বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে যুক্ত। নব্বইয়ের দশকের যে ব্যান্ডসংগীত আন্দোলন নতুন প্রজন্মের মধ্যে গিটার, ব্যান্ড ও লাইভ কনসার্টের প্রতি আগ্রহ তৈরি করেছিল, হাসান সেই ধারার অন্যতম পরিচিত মুখ। ফলে তাঁর মতো শিল্পীর কনসার্টে দর্শকের আচরণ শুধু একটি অনুষ্ঠানের পরিবেশ নয়, সামগ্রিক সংগীত সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবিও হয়ে ওঠে।
এ কারণে বোতল নিক্ষেপের ঘটনায় সমালোচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলভাবে বিষয়টি দেখা এবং ভুল হয়ে থাকলে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে আয়োজকদেরও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিয়ে ভবিষ্যৎ কনসার্টে শিল্পী ও দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
সর্বশেষ যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, বোতল নিক্ষেপের ঘটনাটির স্থান, সময়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং হাসানের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মূলধারার সূত্রে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এসব বিষয়ে নিশ্চিত দাবি না করে বলা যায়, ঘটনাটি ঘিরে যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে তার মূল প্রশ্ন দুটি—কনসার্টে শিল্পীর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত এবং দর্শকের উচ্ছ্বাস কোথায় গিয়ে শালীনতার সীমা অতিক্রম করছে। এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের কনসার্ট সংস্কৃতিকে আরও নিরাপদ ও দায়িত্বশীল করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।