জাতীয়

বোয়েসেলের বিদেশে কর্মী প্রেরণে অগ্রগতি

বোয়েসেলের বিদেশে কর্মী প্রেরণে অগ্রগতি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) ধীরে ধীরে কার্যক্রম বিস্তৃত করছে। কম অভিবাসন ব্যয়ে নিরাপদ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালেও জর্ডান, ব্রুনাই, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সরকারি পোর্টালে বর্তমানে বিদেশি নিয়োগের একাধিক বিজ্ঞপ্তি এবং চলমান নিয়োগপ্রক্রিয়ার তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।

বোয়েসেল মূলত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনশক্তি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। বিদেশি নিয়োগকর্তার চাহিদা সংগ্রহ, প্রার্থী বাছাই, দক্ষতা যাচাই, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং নির্ধারিত নিয়মে কর্মী বিদেশে পাঠানো—এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করে। সরকারি প্ল্যাটফর্মেও বোয়েসেলের মূল লক্ষ্য হিসেবে ‘নৈতিক, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী অভিবাসন’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

২০২৬ সালে বোয়েসেলের কার্যক্রমে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা। প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুনে জর্ডানে দক্ষ কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে জর্ডানের সিরামিক খাতেও দক্ষ পুরুষ কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সময়ে ব্রুনাইয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগ এবং মালয়েশিয়ায় হাউজকিপিং অ্যাটেনডেন্ট পদে নিয়োগের কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মসংস্থান অনুমতি ব্যবস্থা বা ইপিএসের প্রার্থীদের নিয়েও বোয়েসেলের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

জর্ডানের শ্রমবাজারে বোয়েসেলের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশেষ করে নারী পোশাককর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি এই সংস্থার একটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জর্ডানের একটি টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানে ১৫০ জন নারী মেশিন অপারেটর নিয়োগের কথা জানানো হয়েছে। এসব কর্মীর থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা ও বিমানভাড়ার মতো সুবিধা নিয়োগকর্তার পক্ষ থেকে দেওয়ার কথা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

জর্ডানের ক্ষেত্রে বোয়েসেলের কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তুলনামূলক কম অভিবাসন ব্যয়। অতীতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশটিতে নারী কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রার্থীদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কম রাখার উদাহরণ রয়েছে। ২০২৪ সালে জর্ডানের জন্য ৬৫১ জন দক্ষ নারী কর্মী নিয়োগের উদ্যোগে জনপ্রতি মেডিকেল ও আঙুলের ছাপ বাবদ মাত্র ১ হাজার ২২০ টাকা খরচের কথা জানানো হয়েছিল।

দক্ষ কর্মী তৈরির সঙ্গে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সম্পর্কও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিদেশি নিয়োগকর্তারা এখন শুধু শ্রমিকের সংখ্যা নয়, নির্দিষ্ট পেশাগত দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে সরকারি ব্যবস্থায় কর্মী পাঠাতে হলে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা যাচাই এবং নিয়োগকর্তার চাহিদার সঙ্গে প্রার্থীর যোগ্যতার মিল নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

দক্ষতার এই প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় দেশের ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মেও প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মটিতে লাখ লাখ বিদেশগমনপ্রত্যাশী নিবন্ধিত রয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক প্রার্থী প্রশিক্ষণ ও অভিবাসন-সংক্রান্ত বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করছেন। এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তা, বাংলাদেশ মিশন, প্রার্থী, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকারী সংস্থাকে একই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

তবে বোয়েসেলের অগ্রগতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—বিদেশে যাওয়া মোট বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা এবং বোয়েসেলের মাধ্যমে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা এক নয়। ২০২৫ সালে দেশের মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৫১৯ জন বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থান পেয়েছেন বলে সংসদে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে নারী ছিলেন ৬২ হাজার ৩৫২ জন। অর্থাৎ দেশের মোট শ্রম অভিবাসনের তুলনায় বোয়েসেলের অংশ এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত।

২০২৬ সালের প্রথম ১১ মাসের আগেই বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পরিসর আরও বড় হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৫ বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থান পেয়েছেন বলে সংসদে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। পরবর্তী অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণের কথাও তিনি জানান।

সরকার একই সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা করছে। মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমবাজার পুনরায় চালু বা সম্প্রসারণের বিষয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে বলে সংসদে জানানো হয়েছে। এসব বাজার উন্মুক্ত হলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠানোর সুযোগ বাড়তে পারে।

সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। ২০২৫ সালে দেশটিতে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭১৫ বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। একই সময়ে কাতারে ১ লাখ ৭ হাজার ৪৭২, কুয়েতে ৭২ হাজার ৭১৭ এবং সিঙ্গাপুরে ৭০ হাজার ৫৬ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন। এই বিপুল শ্রমবাজারের তুলনায় বোয়েসেলের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ এখনও যথেষ্ট রয়েছে।

বোয়েসেলের অগ্রগতির মূল্যায়নে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা নয়, অভিবাসন ব্যয় ও কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি ব্যবস্থায় বিদেশে যেতে অনেক কর্মীকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। বিপরীতে সরকারি ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার চাহিদা, চাকরির শর্ত ও বেতন কাঠামো তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছভাবে প্রকাশের সুযোগ থাকে। বোয়েসেলের সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও কাজের ধরন, বেতন, বয়স, অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগের শেষ সময় উল্লেখ করা হচ্ছে।

তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বোয়েসেলের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নতুন শ্রমবাজার তৈরি, নিয়োগকর্তার আস্থা অর্জন, দ্রুত প্রার্থী বাছাই, দক্ষ কর্মীর ডাটাবেজ তৈরি এবং নির্ধারিত সময়ে কর্মী পাঠানো—সবগুলো ক্ষেত্রেই সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কোনো বাজারে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ার পর প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে নিয়োগকর্তা অন্য দেশের কর্মী বেছে নিতে পারেন। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে দ্রুত ও দক্ষ সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পশ্চিম মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর সংখ্যা অন্য কয়েকটি শ্রমপ্রেরণকারী দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম ছিল। এতে বোয়েসেলের সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নও ওঠে। অর্থাৎ শুধু সরকারি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান থাকা যথেষ্ট নয়; সেই প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে।

এদিকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। বাংলাদেশি প্রবাসীরা দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান। ফলে নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক শ্রম অভিবাসন বাড়ানো শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে এজন্য শুধু কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো নয়, ভালো বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং দক্ষ কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাকরির সুযোগ তৈরি করাও প্রয়োজন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বোয়েসেলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় কম খরচে দক্ষ কর্মী পাঠানোর একটি বিশ্বাসযোগ্য চ্যানেল তৈরি করা। জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রুনাইয়ের মতো বাজারে চলমান কার্যক্রম সেই সম্ভাবনার উদাহরণ। সরকারি পোর্টালে ২০২৬ সালেও এসব দেশের জন্য ধারাবাহিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়া থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি শ্রমবাজার সম্প্রসারণে সক্রিয় রয়েছে।

সর্বশেষ হিসাবে, দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান সামগ্রিকভাবে বড় আকারে বাড়লেও সরকারি ব্যবস্থায় কর্মী পাঠানোর পরিমাণ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে ১১ লাখের বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থান পেলেও পরবর্তী অর্থবছরের সরকারি লক্ষ্য প্রায় ১৪ লাখ। এই বিশাল শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ যদি স্বচ্ছ ও কম ব্যয়ের সরকারি ব্যবস্থায় আনা যায়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমার পাশাপাশি কর্মীদের প্রতারণা ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের ঝুঁকিও কমতে পারে।

তবে ‘গত অর্থবছরে বোয়েসেলের মাধ্যমে ১৯ হাজারের বেশি কর্মী বিদেশে পাঠানো হয়েছে’—এই নির্দিষ্ট সংখ্যাটি বর্তমান উন্মুক্ত সরকারি উৎসে সরাসরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই সংখ্যাটিকে নিশ্চিত সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে উপস্থাপন না করে বলা যায়, বোয়েসেল বর্তমানে একাধিক শ্রমবাজারে সক্রিয়ভাবে নিয়োগ পরিচালনা করছে এবং দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি চ্যানেলে কর্মী প্রেরণের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই অগ্রগতি কত দ্রুত নতুন শ্রমবাজার, কম অভিবাসন ব্যয় এবং আরও বেশি দক্ষ কর্মী প্রেরণে রূপ নিতে পারে।