আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অস্থির রয়েছে। নতুন করে মার্কিন হামলার হুমকি, ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার আলোচনা—সব মিলিয়ে সংকটের রাজনৈতিক ও সামরিক দুই দিকই সমান্তরালে এগোচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে। ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রণালী দিয়ে নৌযান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রণালীতে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নয়, এশিয়া, ইউরোপসহ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে নৌযান চলাচল কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কাও পুরোপুরি কাটেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার সুযোগ তৈরির জন্য নতুন হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছেন। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দ্রুত সমঝোতার আশাবাদ প্রকাশ করা হলেও ইরানের সঙ্গে আলোচনার শর্ত ও ফলাফল নিয়ে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
ইরানও সম্ভাব্য নতুন মার্কিন হামলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে তেহরান সতর্ক করেছে। একই সঙ্গে ইরান উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সামরিক উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
এই হুমকির ফলে সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা হিসাব আরও জটিল হয়েছে। এসব দেশের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি তেল উৎপাদন, রপ্তানি ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা। ইরাক, ইয়েমেন ও লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘাতের বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে ইরান-সম্পর্কিত গোষ্ঠীগুলোকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানও হয়েছে, যা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইয়েমেনের হুথিদের কর্মকাণ্ডও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে আগে থেকেই ঝুঁকি রয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালীর সংকটের সঙ্গে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে চাপ আরও বাড়তে পারে।
তবে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও চলছে। ইরান, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হরমুজকেন্দ্রিক আলোচনার অগ্রগতি থেকে বোঝা যাচ্ছে, সরাসরি সংঘাত বাড়ানোর পরিবর্তে অন্তত কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতার পথ খোঁজা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হলে তা বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার জন্যও একটি প্রাথমিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষণ রয়েছে।
কিন্তু এই সম্ভাব্য সমঝোতার পথ সহজ নয়। হরমুজ দিয়ে কোন দেশের জাহাজ চলাচল করবে, নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে, সামরিক জাহাজের অবস্থান কী হবে এবং ইরানের ওপর থাকা মার্কিন চাপ বা নিষেধাজ্ঞার কী হবে—এসব প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও বাস্তবে নৌপথ পুরোপুরি খুলতে আরও সময় লাগতে পারে।
মানবিক পরিস্থিতিও সংকটের বড় অংশ। চলমান সংঘাতে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বেসামরিক মানুষের হতাহত, বাস্তুচ্যুতি এবং স্বাস্থ্যসেবা ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শিশু ও অন্যান্য বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন একদিকে সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনার মধ্যবর্তী অবস্থায় রয়েছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনায় অগ্রগতি আশার সংকেত দিলেও চূড়ান্ত চুক্তি এখনো হয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার আশঙ্কা এবং ইরানের পাল্টা হুমকি পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে রেখেছে।
আগামী কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল কতটা স্বাভাবিক হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা এগোয় কি না এবং ইরান নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেয় কি না—এসব বিষয়ই মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আপাতত যুদ্ধ ও কূটনীতি—দুই পথই খোলা রয়েছে।