কলাম

জুলাইয়ের নারীরা কোথায়?

জুলাইয়ের নারীরা কোথায়?

“জুলাইয়ের নারীরা কোথায়?”—প্রশ্নটি এখন আর কেবল আবেগের নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, অভিভাবক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্দোলনকে বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি দিয়েছিল। তাঁদের কেউ রাজপথে ছিলেন, কেউ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন, কেউ আহত হয়েছেন, কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, আবার অনেকে ঘরে থেকেও আন্দোলনকারীদের সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃশ্যমান পরিসরে সেই নারীদের উপস্থিতি প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যাচ্ছে কি না, সেটিই এখন ভাবনার বিষয়। বিভিন্ন বিশ্লেষণেও জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্বের এই ঘাটতির প্রশ্নটি উঠে এসেছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস লিখতে গেলে নারীর ভূমিকা বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আন্দোলনের শুরুর পর্যায় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের নারী শিক্ষার্থীরা রাজপথে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নারী শিক্ষার্থীরা মিছিল, সমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনাও জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। সঞ্জিদা আহমেদ তন্নীর আহত অবস্থার একটি ছবি আন্দোলনের সহিংস বাস্তবতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

নারীর অংশগ্রহণ কেবল রাজপথে উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, আন্দোলনকারীদের জন্য সহায়তা সংগঠিত করা, আহতদের পাশে দাঁড়ানো, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাপ মোকাবিলা করা—এসব ক্ষেত্রেও নারীদের ভূমিকা ছিল। ফলে জুলাইয়ের আন্দোলনকে কেবল পুরুষ নেতৃত্বাধীন বা পুরুষকেন্দ্রিক একটি রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুল্লেখিত থেকে যাবে।

এই আন্দোলনে নারী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্য ও প্রতিবেদন অনুযায়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১১ নারী শহীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অনুসন্ধানের মাধ্যমে শনাক্ত করেছে। নাঈমা সুলতানা, নাফিসা হোসেন মারওয়া, মেহেরুন নেছাসহ নিহত নারীদের জীবন ও পরিবারের গল্প প্রমাণ করে, জুলাইয়ের মূল্য শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না; এর সঙ্গে অসংখ্য পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতি ও স্বজন হারানোর বেদনা যুক্ত রয়েছে।

অতএব, “জুলাইয়ের নারীরা কোথায়?” প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে তাঁরা জুলাইয়ে ছিলেন। তাঁরা দর্শক ছিলেন না; তাঁরা আন্দোলনের অংশ ছিলেন। প্রশ্নটি তাঁদের উপস্থিতি নিয়ে নয়, বরং অভ্যুত্থানের পর তাঁদের অবদান কতটা স্বীকৃতি পেয়েছে এবং তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় কতটা সুযোগ পেয়েছেন—তা নিয়ে।

ইতিহাসে এমন ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও নারীর অবদান দীর্ঘদিন যথাযথভাবে আলোচিত ও স্বীকৃত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের মতো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসেও যদি নারীর অবদান কেবল স্মরণসভা, প্রদর্শনী কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা হবে ইতিহাসের প্রতি অসম আচরণ। জুলাইয়ের নারীদের নিয়ে প্রদর্শনী ও স্মরণমূলক আয়োজন হয়েছে, যা তাঁদের অবদানকে দৃশ্যমান করার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট দল বা সংগঠনের নারী শাখা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। রাজনীতি, প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, অর্থনীতি, আইন প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় নারীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই হতে হবে জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী চেতনার বাস্তব পরীক্ষা। ২০২৬ সালেও রাজনৈতিক পরিসরে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং আন্দোলনের সময় রাজপথে দৃশ্যমান নারীদের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিসরে তুলনামূলক কম দেখা যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—নারীকে সামনে আনতে হবে করুণা বা প্রতীকী প্রতিনিধিত্বের জন্য নয়। তাঁদের সক্ষমতা, নেতৃত্ব, রাজনৈতিক মত, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নাগরিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েই সুযোগ দিতে হবে। একইভাবে জুলাইয়ের নারী অংশগ্রহণকারীদের কারও রাজনৈতিক অবস্থান পছন্দ না হলে তাঁর অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। মতের পার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ; অবদান মুছে ফেলা গণতান্ত্রিক চর্চা নয়।

নারী ও শিশুদের বিষয়ে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। জুলাইয়ের ঘটনায় কোনো নারী বা শিশুর ব্যক্তিগত পরিচয়, পারিবারিক তথ্য, ছবি বা অভিজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে যৌন সহিংসতা বা অন্য কোনো সংবেদনশীল নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। ন্যায়বিচারের দাবিকে শক্তিশালী করার নামে নতুন করে ভুক্তভোগীর ক্ষতি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের কল্যাণ ও পুনর্বাসনের জন্য ২০২৬ সালে আইন প্রণীত হয়েছে। একই সঙ্গে নারী ও শিশু শহীদ এবং জুলাই যোদ্ধাদের স্মরণে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিও হয়েছে। এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ; তবে স্বীকৃতি শুধু তালিকা, ভাতা বা স্মরণানুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ইতিহাসে তাঁদের ভূমিকা যথাযথভাবে সংরক্ষণ, গবেষণা, পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি এবং জনপরিসরে সম্মানজনকভাবে তুলে ধরাও প্রয়োজন।

জুলাইয়ের নারীদের খুঁজে পাওয়া মানে কেবল কয়েকজন পরিচিত মুখকে সামনে আনা নয়। এর অর্থ হলো আন্দোলনের মাঠপর্যায়ে থাকা অসংখ্য নারীকে খুঁজে বের করা, তাঁদের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করা এবং ইতিহাসে তাঁদের যথাযথ জায়গা নিশ্চিত করা। গ্রাম, মফস্বল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও শহরের পাড়া-মহল্লায় যেসব নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের কথাও একই গুরুত্বে সংরক্ষণ করতে হবে।

সবশেষে প্রশ্নটি তাই আরও বিস্তৃত হওয়া দরকার—জুলাইয়ের নারীরা কোথায়, তা নয়; জুলাইয়ের নারীদের জন্য আমরা কোথায় জায়গা তৈরি করেছি? যে আন্দোলন বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে, সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার যদি নারীর সমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে জুলাইয়ের মূল শিক্ষাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

জুলাইয়ের ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। এটি সেই সব মানুষের ইতিহাস, যারা অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সেই ইতিহাসে নারীর অবদান যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনি তাঁদের ভবিষ্যৎও কেবল অতীতের স্মৃতিতে আটকে রাখা যাবে না। জুলাইয়ের নারীদের প্রকৃত সম্মান হবে এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণ করা, যেখানে তাঁরা দর্শক নন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমান অংশীদার।

 

লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা, ঢাকা, বাংলাদেশ।