শিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত শিক্ষক, দক্ষ শিক্ষক এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাঠ্যক্রমের ধারাবাহিক পরিবর্তন, মুখস্থনির্ভরতা, মূল্যায়ন পদ্ধতির দুর্বলতা, অবকাঠামোগত বৈষম্য এবং শিক্ষার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। ফলে শুধু শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; তারা কী শিখছে এবং সেই শিক্ষা ভবিষ্যৎ জীবনে কতটা কাজে লাগছে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যে দেশের সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ৯২ হাজারের বেশি শিক্ষক পদ শূন্য থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এর মধ্যে বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ৭৭ হাজার ২২৭টি এবং সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ হাজার ৮৪২টি শিক্ষক পদ শূন্য। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অনুমোদিত ১৫ হাজার ৮৪৪টি শিক্ষক পদের মধ্যে ৮ হাজার ৪৮৬টি শূন্য রয়েছে। এত বড় শূন্যতা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি সরাসরি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের ধারাবাহিকতা ও শিক্ষার মানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রাথমিক শিক্ষায় পরিস্থিতির আরেকটি দিক বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে দীর্ঘদিনের শূন্যতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষকদের সমন্বয়কে দুর্বল করতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সরকার জানিয়েছে, ৩৬ হাজার ২৩৫টি শূন্য প্রধান শিক্ষক পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদে পদোন্নতির ফলে যে ৩৮ হাজার ৪৪৩টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য হবে, সেগুলোও দ্রুত পূরণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
তবে শুধু নিয়োগ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষক নিয়োগ হতে হবে মেধা, যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে। প্রত্যন্ত অঞ্চল, চর, হাওর, পাহাড়ি এলাকা এবং দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট তুলনামূলকভাবে বেশি হলে সেখানে বিশেষ প্রণোদনা ও কার্যকর জনবল পরিকল্পনা প্রয়োজন। একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণি সামলাতে বাধ্য করা কিংবা দীর্ঘদিন অস্থায়ী ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা কোনো টেকসই শিক্ষা নীতি হতে পারে না।
শিক্ষার মানের প্রশ্নে শিক্ষকসংখ্যার পাশাপাশি শিক্ষকতার মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। UNESCO-এর শিক্ষাবিষয়ক কাঠামোতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাতকে শিক্ষার সুযোগ ও মান মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো বা শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষককে নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিশুবান্ধব শ্রেণিকক্ষ পরিচালনায় দক্ষ করে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো নীতির সঙ্গে বাস্তবায়নের ব্যবধান। ২০২৬ সালে ইউনিসেফের গবেষণাতেও বলা হয়েছে, শিক্ষার ফল উন্নত করতে শুধু ভালো নীতি গ্রহণ যথেষ্ট নয়; শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষাকেন্দ্রে সেই নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ রাজধানী বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি প্রত্যন্ত বিদ্যালয়ে শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠদান, শিখনফল, মূল্যায়ন ও শিক্ষার্থীর নিরাপদ পরিবেশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে পরীক্ষার ফলকে একমাত্র সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল, তার পাশাপাশি সে যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারে কি না, সমস্যা সমাধান করতে পারে কি না, প্রযুক্তি ও তথ্যকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে পারে কি না, অন্যের অধিকার ও মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কি না—এসব বিষয়ও শিক্ষার অংশ। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়; দায়িত্বশীল, দক্ষ, মানবিক ও আত্মনির্ভর নাগরিক তৈরি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
শিশুর অধিকার রক্ষার বিষয়টি শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রেই রাখতে হবে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার সনদে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিকভাবে মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত। বাস্তবে দরিদ্র পরিবারের শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশু এবং বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশু যেন শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে এবং দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও প্রতিবন্ধিতাসহ নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষ করে মেয়েশিশুর শিক্ষা অব্যাহত রাখতে বিদ্যালয়কে নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশে পরিণত করা জরুরি। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কোনো শিশুকে দায়ী না করে ঝরে পড়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ চিহ্নিত করতে হবে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক বা মানসিক শাস্তি, বৈষম্য, হয়রানি কিংবা শিশুর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এমন আচরণের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষক সংকট সমাধানে তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনা। কোন এলাকায় কত শিক্ষক প্রয়োজন, কোন বিষয়ে শিক্ষক ঘাটতি বেশি, কোথায় শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত বেশি, কতজন শিক্ষক অবসরে যাবেন এবং নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হলে কত জনবল প্রয়োজন হবে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে আগাম নিয়োগ পরিকল্পনা করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করা এবং একই সঙ্গে শিক্ষক বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষকদের মর্যাদা, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত উন্নয়নও শিক্ষা সংস্কারের অপরিহার্য অংশ। একজন শিক্ষককে কেবল পাঠদানের কর্মী হিসেবে দেখলে চলবে না; তাকে শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রধান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রশাসনিক ও অশিক্ষকসুলভ অতিরিক্ত দায়িত্ব কমিয়ে শিক্ষকদের পাঠদান, শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ও পেশাগত উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
অবশেষে বলতে হয়, শিক্ষক সংকট শিক্ষা ব্যবস্থার একটি দৃশ্যমান সমস্যা হলেও এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কাঠামোগত দুর্বলতা। নিয়োগে ধীরগতি, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, বৈষম্যমূলক সুযোগ, দুর্বল তদারকি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতির বারবার পরিবর্তন—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে শিক্ষার্থীর অধিকার, শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা এবং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ হলো মানসম্মত শিক্ষক ও মানসম্মত শিক্ষায় বিনিয়োগ। শূন্য পদ পূরণ, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বৈষম্যহীন সুযোগ, শিশুবান্ধব পরিবেশ এবং বাস্তবমুখী শিক্ষাক্রম—এই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষক সংকটকে কেবল নিয়োগের সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে এখনই কার্যকর, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা, ঢাকা, বাংলাদেশ।