কলাম

বিশ্বজুড়ে Gen Z বিক্ষোভে বদলের বার্তা

বিশ্বজুড়ে Gen Z বিক্ষোভে বদলের বার্তা

বিশ্বজুড়ে রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রচলিত কাঠামো নিয়ে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ ক্রমেই রাস্তায় নামছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর যোগাযোগ, নেতৃত্বের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা এবং কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, বৈষম্য, শিক্ষাব্যবস্থা ও জবাবদিহির দাবিকে সামনে রেখে Generation Z বা Gen Z-এর বিভিন্ন আন্দোলন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া ও ভারতের মতো দেশে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। গবেষণায় এই ধারাকে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্রুত বিস্তার লাভ করা ডিজিটাল-নির্ভর যুব আন্দোলনের নতুন রূপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন। সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত রাজনৈতিক জবাবদিহি ও সংস্কারের বৃহত্তর দাবিতে রূপ নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলনের সমন্বয়, তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণাতেও ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, হ্যাশট্যাগ, ভিডিও ও ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে তরুণদের দ্রুত সংগঠিত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

তবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি মানবাধিকারের গুরুতর প্রশ্নও সামনে এনেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়ের অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের আন্দোলন ঘিরে ব্যাপক প্রাণহানি, আহত হওয়া, নির্বিচার আটক এবং মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারে গুরুতর হস্তক্ষেপের তথ্য উঠে আসে। জাতিসংঘের হিসাবে ওই সময়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, যাদের মধ্যে শতাধিক শিশু ছিল। একই সঙ্গে আন্দোলন-পরবর্তী প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

এই আন্দোলনে নারী ও শিশুর অংশগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও আলাদা গুরুত্ব বহন করে। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আন্দোলন ও পরবর্তী অস্থিরতার প্রভাব নারী, কিশোরী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ওপর অসমভাবে পড়েছে। তাই Gen Z আন্দোলন নিয়ে আলোচনায় শুধু রাজনৈতিক ফলাফল নয়, নারী, শিশু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদাকেও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

বাংলাদেশের পর দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হয়ে ওঠে নেপাল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তরুণদের ক্ষোভ ব্যাপক বিক্ষোভে রূপ নেয়। এর সঙ্গে দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি, বেকারত্ব ও দেশে কর্মসংস্থানের সংকটের মতো দীর্ঘদিনের অসন্তোষ যুক্ত হয়। আন্দোলনকারীদের বড় অংশ ছিল তরুণ; পরিস্থিতি সহিংসতায় গড়ালে প্রাণহানি ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব ও অর্জন নিয়ে তরুণদের মধ্যেই হতাশা তৈরি হয়।

শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের গণবিক্ষোভও বর্তমান Gen Z আন্দোলনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্যসংকট এবং সরকারের প্রতি আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কা, ২০২৪ সালের বাংলাদেশ এবং ২০২৫ সালের নেপালের আন্দোলনকে তুলনা করে সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষোভের সঙ্গে ডিজিটাল যোগাযোগ এবং প্রজন্মগত রাজনৈতিক সচেতনতা যুক্ত হয়ে দ্রুত বিস্তার লাভকারী আন্দোলনের পরিবেশ তৈরি করেছে।

ভারতে ২০২৬ সালে Gen Z আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, চাকরির সংকট ও সুযোগের বৈষম্য নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ থেকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে পরিচিত একটি অরাজনৈতিক যুব আন্দোলন সামনে আসে। দিল্লিকেন্দ্রিক বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেয় এবং আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। পরে তিনি পদত্যাগ করেন। আন্দোলনটি নির্বাচনী রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশের বদলে সামাজিক চাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার অবস্থান নিয়েছে।

ভারতের ঘটনা আরও একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তরুণদের রাজনৈতিক সমর্থন অর্জনে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দল ও সরকারগুলোকে নতুন কৌশল নিতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক যোগাযোগ কৌশলকে বিশ্লেষকেরা Gen Z-এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ফলে বিক্ষোভ শুধু সরকারের নীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষা ও মাধ্যমও বদলে দিচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে কেনিয়ার ২০২৪ সালের তরুণদের বিক্ষোভও এই বৈশ্বিক প্রবণতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রস্তাবিত কর বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি নিয়ে তরুণরা আন্দোলনে নামে। পরে কর প্রস্তাব প্রত্যাহার ও মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা হলেও বিক্ষোভকারীদের দাবি কেবল করনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তারা জবাবদিহি, পুলিশি আচরণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কারের প্রশ্নও সামনে আনে। ২০২৫ সালেও কেনিয়ায় Gen Z-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া যায়।

এই আন্দোলনগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে। তরুণদের বড় অংশ প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে এবং দলীয় কাঠামোর পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন নেটওয়ার্ক, স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ ও সমন্বিত ডিজিটাল প্রচারের ওপর নির্ভর করছে। দুর্নীতি, বেকারত্ব, শিক্ষার সুযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈষম্য, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে প্রতিটি দেশের ইতিহাস, প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা হওয়ায় একটি দেশের আন্দোলনের মডেল সরাসরি অন্য দেশে প্রয়োগ করা যায় না।

Gen Z আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি যেমন দ্রুত জনসমর্থন তৈরি করা, তেমনি এর বড় চ্যালেঞ্জও দ্রুততার মধ্যেই নিহিত। নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ, অভিন্ন কর্মসূচির অভাব এবং আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনা বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রত্যাশা পূরণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। নেপালের পরবর্তী অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, মতপ্রকাশ ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদেরও অন্যের জীবন, সম্পদ ও অধিকার রক্ষা এবং সহিংসতা পরিহারের দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ যেমন গুরুতর মানবাধিকার সংকট তৈরি করতে পারে, তেমনি আন্দোলন-পরবর্তী প্রতিশোধমূলক সহিংসতাও নতুন অধিকার লঙ্ঘনের জন্ম দিতে পারে।

বিশ্বজুড়ে Gen Z-এর বিক্ষোভ তাই কেবল তরুণদের প্রতিবাদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের কাছে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রত্যাশার প্রকাশ। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন থেকে নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তন, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকেন্দ্রিক বিক্ষোভ কিংবা কেনিয়ার সুশাসন ও অর্থনৈতিক দাবির আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই তরুণরা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করছে। তাদের এই প্রশ্নের উত্তর শুধু পুলিশি নিয়ন্ত্রণ বা রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়; প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি, কর্মসংস্থান, ন্যায়সংগত সুযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের কার্যকর সুরক্ষা। সেই অর্থে Gen Z-এর বর্তমান বিক্ষোভ বিশ্ব রাজনীতির জন্য শুধু একটি সাময়িক আন্দোলনের ঢেউ নয়, বরং রাষ্ট্র ও তরুণ সমাজের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়, জাতিসংঘ বাংলাদেশ, ইউএন উইমেন, ইউনিসেফ, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং সাম্প্রতিক একাডেমিক গবেষণা।

 

লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা, ঢাকা, বাংলাদেশ।