কলাম

বৈশ্বিক রাজনীতির খবরেও নজর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে

বৈশ্বিক রাজনীতির খবরেও নজর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টড ব্লঁশকে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত ও কূটনৈতিক তৎপরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ভারতীয় রাজনীতির পরিবর্তনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পাচ্ছে। এর পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংবাদমূল্য নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও প্রবাসী নাগরিকদের স্বার্থের সঙ্গে এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের ঘটনাটি এর সাম্প্রতিক একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোনীত টড ব্লঁশকে ৮ আগস্ট মার্কিন সিনেট ৫০-৪৯ ভোটে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে অনুমোদন করেছে। এর আগে তিনি ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর নিয়োগ নিয়ে মার্কিন আইন বিভাগ কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের পেশাগত সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে এবং বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।

ব্লঁশের নিয়োগের বিষয়টি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে গুরুত্ব পাওয়ার আরেকটি কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের বড় বাজার। একই সঙ্গে ভিসা, শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, নির্বাচন, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও অভিবাসন নীতির মতো বিষয়েও ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঘটনাবলি কাভার করার ধারাবাহিকতাও সাম্প্রতিক খবরের তালিকায় স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক সংবাদ বিভাগগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, নতুন মার্কিন শুল্ক, বাংলাদেশের রপ্তানি, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ওয়াশিংটন-ঢাকা সম্পর্কের মতো বিষয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক ঘটনাও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নিচ্ছে। ভারতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্বাচন ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সম্পর্ক, ফিলিপাইনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—এসব বিষয় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের আন্তর্জাতিক পাতায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে বেশি সংযুক্ত হচ্ছে। কোনো দেশে যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম পরিবর্তিত হতে পারে এবং বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার সময় তেলের দাম ও বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার খবর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে গুরুত্ব পাওয়ার পেছনেও এই বাস্তবতা কাজ করছে।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি বাংলাদেশের জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন শুল্কনীতি ও বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি পণ্যের প্রবেশাধিকার, শুল্কহার এবং বাণিজ্যিক নীতির পরিবর্তন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, এলডিসি উত্তরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন। বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সামনে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভারসাম্য, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ একাধিক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন।

এ কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদ বাংলাদেশের গণমাধ্যমে কেবল বিদেশের খবর হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে না; বরং এসব ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রভাবও তুলে ধরা হচ্ছে। কোনো দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী শ্রমবাজার, জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তা স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় সংবাদমূল্য পায়।

তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই ও ভারসাম্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির বক্তব্যকে একতরফাভাবে সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য, নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এবং সরকারি নথির সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। টড ব্লঁশের নিয়োগের ক্ষেত্রেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সমর্থকদের বক্তব্যের পাশাপাশি সিনেটরদের আপত্তি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার তথ্য সামনে এসেছে।

বিশ্ব রাজনীতির এমন ঘটনাগুলো বাংলাদেশের পাঠকের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাই শুধু ‘কী ঘটেছে’ জানানো যথেষ্ট নয়। ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কী, এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব কী, কোন পক্ষ কী বলছে এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তরও সংবাদে থাকা প্রয়োজন। 5W1H পদ্ধতিতে সংবাদ উপস্থাপন করলে আন্তর্জাতিক ঘটনাকে বাংলাদেশের পাঠকের জন্য সহজবোধ্য ও প্রাসঙ্গিক করে তোলা সম্ভব।

বিশ্ব এখন পারস্পরিক নির্ভরশীল। ওয়াশিংটনের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ঢাকার ব্যবসায়িক অঙ্গনে প্রভাব ফেলতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের একটি সামরিক সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয় বাড়াতে পারে, আবার ইউরোপ বা এশিয়ার কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও কূটনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। সেই কারণে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ থেকে শুরু করে বৃহত্তর বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তন—সবকিছুকেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমে জাতীয় স্বার্থের আলোকে তথ্যনির্ভর, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

 

লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা, ঢাকা, বাংলাদেশ।