নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ভূমি ও প্লট বরাদ্দ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অন্যতম বড় খাত হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পসহ বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে সাবেক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে বিশেষ সুবিধায় প্লট বরাদ্দের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আদালত এসব অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নিয়েছে। শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পূর্বাচল প্লট মামলায় ইতোমধ্যে রায় এসেছে, আর সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ অন্যান্যদের দেশ-বিদেশের শত শত সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া শুধু ব্যক্তিগত জবাবদিহির বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাটের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের কূটনৈতিক জোনে (সেক্টর ২৭, রোড ২০৩ এলাকায়) ছয়টি ১০ কাঠা করে মোট ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দের ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোট বোন শেখ রেহানা, ভাগ্নে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি এবং ভাগ্নি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিকের নামে এই প্লটগুলো বরাদ্দ করান। অভিযোগে বলা হয়, তাঁরা ঢাকায় ইতোমধ্যে বাড়ি, ফ্ল্যাট বা আবাসিক সম্পত্তির মালিক থাকা সত্ত্বেও রাজউকের নিয়ম অনুযায়ী মিথ্যা হলফনামা জমা দিয়ে দাবি করেন যে তাঁদের বা পরিবারের কোনো সদস্যের নামে ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জে কোনো প্লট নেই। এই মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতেই প্লট বরাদ্দ অনুমোদিত হয়। দুদক ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ছয়টি পৃথক মামলা করে, কারণ প্রতিটি প্লট আলাদা দলিলে বরাদ্দ করা হয়েছিল। মামলায় শেখ হাসিনাসহ পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, সাবেক সচিব, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ও সদস্যদেরও আসামি করা হয়।
আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে সাক্ষীদের জবানবন্দিতে উঠে আসে যে, শেখ হাসিনা তাঁর স্বামীর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি সন্তানদের নামে হস্তান্তর করেছিলেন এবং কর বিবরণীতেও ঢাকায় সম্পত্তির কথা উল্লেখ ছিল। তবুও হলফনামায় ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়। রাজউকের কর্মকর্তারা ক্ষমতার প্রভাবে নিয়ম লঙ্ঘন করে বরাদ্দ অনুমোদন দেন বলে অভিযোগ। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৬ সালের শুরুতে একাধিক মামলায় রায় ঘোষিত হয়। শেখ হাসিনাকে পৃথক মামলায় পাঁচ থেকে দশ বছর করে মোট দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জয় ও পুতুলকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড, টিউলিপ সিদ্দিককে দুই থেকে চার বছর এবং অন্যান্য পরিবারের সদস্যদেরও দণ্ড দেওয়া হয়। জরিমানা এবং সংশ্লিষ্ট প্লট বাতিলের আদেশও দেওয়া হয়। অনেক আসামি বিদেশে থাকায় বিচার অনুপস্থিতিতে চলে এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকে।
এই মামলাগুলো শুধু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁদের বিরুদ্ধেও রায় হয়। সাবেক কর্মকর্তারা ক্ষমতার প্রভাবে নিয়ম ভেঙে বরাদ্দ দিয়েছেন বলে আদালত মনে করেছে। পূর্বাচল ছাড়াও অন্যান্য প্রকল্পেও অনুরূপ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ড্রাইভারসহ কর্মচারীদের নামেও বিশেষ বিবেচনায় প্লট বরাদ্দের অভিযোগ দুদক তদন্ত করেছে। অনেকেই “বিশেষ অবদান” কোটায় প্লট পেয়েছেন, অথচ তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের মামলা ভূমি দুর্নীতির আরেকটি বড় উদাহরণ। তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার এবং ব্যাংক থেকে টাকা আত্মসাতের একাধিক মামলা চলছে। আলজাজিরাসহ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল যে, তিনি যুক্তরাজ্যে শত শত বিলাসবহুল সম্পত্তির মালিক। দুদকের তদন্তে দেখা যায়, তাঁর ও পরিবারের নামে যুক্তরাজ্যে ৩০০-এর বেশি, দুবাইতে ২০০-এর বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি সম্পত্তি রয়েছে। দেশে চট্টগ্রামের আনোয়ারাসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত বিঘা জমি, ফ্ল্যাট ও শেয়ার রয়েছে। আদালত একাধিক আদেশে তাঁর দেশ-বিদেশের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৯৫৭ বিঘা জমি, শত কোটি টাকার শেয়ার, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং বিদেশি ফ্ল্যাট। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সিও কিছু সম্পত্তি জব্দ বা ফ্রিজ করেছে। তাঁর ভাই-বোন ও স্ত্রীর নামেও সম্পদ জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে। দুদক বলেছে, তাঁর সম্পদের পরিমাণ পরিচিত আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং অর্থপাচারের মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
এছাড়া সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া ও পরিবারের জমি-প্লট, অন্যান্য সাবেক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ভূমি সংশ্লিষ্ট সম্পদও জব্দ করা হয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংস্থাটি আদালতের আদেশে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ ও ফ্রিজ করেছে, যার মধ্যে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি এবং ব্যাংক হিসাব অন্তর্ভুক্ত। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএফআইইউ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে অর্থপাচারকৃত সম্পদ ফেরত আনার চেষ্টা চলছে।
এই মামলা ও জব্দ প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা। ভূমি বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, দালাল চক্র এবং কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার এসব দুর্নীতিকে উৎসাহিত করেছে। সাধারণ মানুষ যখন ন্যায্যভাবে প্লট বা জমি পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন, তখন প্রভাবশালীরা সহজেই বিশেষ সুবিধায় বরাদ্দ পেয়ে যান। এর ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হয়, সামাজিক বৈষম্য বাড়ে এবং জনআস্থা ক্ষুণ্ন হয়। পূর্বাচলের মতো প্রকল্পে কূটনৈতিক জোনের মতো মূল্যবান জমি এভাবে বরাদ্দ হওয়া দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।আদালতের রায়গুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অনেক আসামি বিদেশে থাকায় প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়া জটিল। সম্পদ পুনরুদ্ধারও সময়সাপেক্ষ, বিশেষ করে বিদেশি সম্পত্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা প্রয়োজন। দুদকের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত তদন্ত এবং বিচার নিষ্পত্তির ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে ভূমি বরাদ্দ নীতিমালা সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম না ঘটে।
সাবেক প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে এই মামলা ও সম্পদ জব্দ প্রক্রিয়া দেশের দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে ক্ষমতায় থাকাকালীন কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। তবে শুধু শাস্তি নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ বারবার উপেক্ষিত হবে। দুদক, আদালত ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই জাল ছিন্ন করতে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করতে।
এই ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দুর্নীতির মূলোৎপাটন শুধু মামলা বা জব্দের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নাগরিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না। পূর্বাচলের প্লট মামলা এবং সাইফুজ্জামানের সম্পদ জব্দ এরই প্রমাণ যে, জনগণের চাপ এবং প্রতিষ্ঠানের সক্রিয়তা একসঙ্গে কাজ করলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছ ও ন্যায্য ভূমি ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যেতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ সত্যিকার অর্থে জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।