জাতীয়

ঋণ কেলেঙ্কারির জালে ব্যাংক খাত

ঋণ কেলেঙ্কারির জালে ব্যাংক খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

ব্যাংকিং খাতে ঋণ জালিয়াতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থপাচারের অভিযোগ একের পর এক তদন্ত ও মামলার মাধ্যমে সামনে আসছে। বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী থেকে শুরু করে ব্যাংকের সাবেক পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একাধিক মামলায় হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ ও আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও খেলাপি ঋণের ব্যাপক চাপের চিত্র উঠে এসেছে। ফলে ব্যাংক খাতে ঋণ অনুমোদন, জামানত মূল্যায়ন, পুনঃতফসিল, তদারকি এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।

বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে আরও আলোচনায় এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫ প্রকাশের পর। ২৫ জুন ২০২৬ প্রকাশিত ওই জরিপে ব্যাংকিং সেবাসহ ১৭টি সেবা খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জরিপে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে এবং ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন সেবায় ঘুষ লেনদেনের আনুমানিক পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে টিআইবি জানিয়েছে। তবে এই জরিপ মূলত নাগরিকের সেবা গ্রহণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে; বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণ কেলেঙ্কারির পরিমাণ নির্ধারণ করা এর উদ্দেশ্য নয়।

ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের মাত্রা বোঝা যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, মার্চ ২০২৬-এ ব্যাংক খাতের মোট ঋণের মধ্যে স্থূল খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই অনুপাত রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঋণ শ্রেণীকরণের কঠোরতা, ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক চাপ এবং ব্যাংক পরিচালনায় কাঠামোগত দুর্বলতাকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত তদন্তগুলোর একটি এস আলম-সংশ্লিষ্ট ঋণ অনিয়ম। দুদক ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৯ হাজার ২৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ঋণের নামে আত্মসাৎ এবং এর একটি অংশ সিঙ্গাপুরে পাচারের অভিযোগে এস আলম ও ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তাসহ ৬৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় সুদ ও অন্যান্য হিসাবসহ সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৪৭৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম এবং অর্থপাচারের বিষয় রয়েছে। এসব অভিযোগ এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়; অভিযুক্তদের দায় আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকেও এস আলম-সংশ্লিষ্ট ঋণ নিয়ে একাধিক মামলা করেছে দুদক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি মামলায় গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১ হাজার ৯৬৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকার ঋণ অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়। দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ঋণগ্রহীতারা ব্যাংকের নিয়ম লঙ্ঘন করে ঋণসীমা নিয়েছিলেন এবং ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।

এরপর একই ব্যাংকের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখা থেকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৬ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগে আরও তিনটি মামলা করে দুদক। মামলাগুলোতে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর শীর্ষ ব্যক্তিদের পাশাপাশি ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছে। অভিযোগে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা না থাকা, ঋণের শর্ত লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিষয় রয়েছে।

এস আলম-সংশ্লিষ্ট ঋণ অনিয়মের ব্যাপ্তি নিয়ে সংসদে প্রকাশিত তথ্যও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে অর্থমন্ত্রী জানান, গত বছরের শেষ নাগাদ ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ২০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় এস আলম-সংশ্লিষ্ট ১১টি কোম্পানি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওই ২০ প্রতিষ্ঠানের মোট দায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

শুধু এস আলম নয়, বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট ঋণ নিয়েও দুদকের একাধিক মামলা চলমান। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সালমান এফ রহমানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎ, শেয়ারবাজার কারসাজি ও অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করা হয়। দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানো হয়েছিল এবং অর্থের একটি অংশ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট আরও পাঁচটি মামলায় জনতা ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি পোশাক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া প্রায় ২৮ হাজার ৮০১ মিলিয়ন টাকা বা ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিদেশে পাচারের অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে। এসব মামলায় বেক্সিমকোর শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।

বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট একটি পৃথক মামলায় রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থপাচারের অভিযোগে সালমান এফ রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদকে চার দিনের রিমান্ডেও নেওয়া হয়। মামলাটি জনতা ব্যাংকের ঋণ ও রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের অর্থ ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট অর্থপাচারের আরেক মামলায় আদালত অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেছে।

ওরিয়ন গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ঋণ নিয়েও দুদকের মামলা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিমসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এতে প্রায় ৫০৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে।

জাতীয় ব্যাংকেও বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে ৯০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে দুদক। অভিযোগ অনুযায়ী, ভুয়া নির্মাণকাজের চুক্তিপত্র ব্যবহার করে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া ও পরে তা নগদ লেনদেন, পে-অর্ডার ও ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঋণ অপরিশোধিত থাকায় সুদ ও অন্যান্য চার্জসহ ব্যাংকের ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে ৯০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বেশি হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের ঘটনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—ঋণ জালিয়াতিতে শুধু ঋণগ্রহীতাই নয়, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাও কীভাবে যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক মামলাগুলোতে একাধিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক, শাখা কর্মকর্তা এবং ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। ফলে বড় ঋণ অনিয়মের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক ভূমিকা নিয়েও আলাদা তদন্ত চলছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দুদক সাবেক তিন গভর্নর আতিউর রহমান, ফজলে কবির ও আবদুর রউফ তালুকদারের বিরুদ্ধে নীতিগত সিদ্ধান্তে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত নথি চেয়েছে। তদন্তে একক ঋণগ্রহীতা সীমা, বড় ঋণের পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন, এস আলম-সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট নীতিগত অনুমোদনের নথি চাওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্তাধীন এবং কোনো ব্যক্তির অপরাধ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।

ঋণ কেলেঙ্কারির আরেকটি বড় দিক হলো বিদেশে অর্থ ও সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক বিদেশে পাচার হওয়া খেলাপি ঋণের অর্থ উদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে। এ কাজে নয়টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকগুলো গোপনীয়তা চুক্তি করেছে এবং প্রাথমিকভাবে ছয়টি ঘটনায় আইনি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এসব ঘটনার মধ্যে এস আলম, বেক্সিমকো, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপের নাম রয়েছে।

ঋণ কেলেঙ্কারির ক্ষতি শুধু ব্যাংকের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি বড় ঋণ অনিয়মিত হয়ে গেলে ব্যাংকের মূলধন, তারল্য ও ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়। খেলাপি ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত সংরক্ষণ রাখতে হয়। এর ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হতে পারে। শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের দুর্বলতা আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এর আলোকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জরিপে ব্যাংকিং সেবাকে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের সময় কী ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের মুখোমুখি হন, তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে বড় ঋণ কেলেঙ্কারির তদন্ত দেখাচ্ছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার আরেকটি স্তরে বড় অঙ্কের অর্থায়ন ও ঋণ অনুমোদনেও জবাবদিহির প্রশ্ন রয়েছে। দুই ধরনের তথ্য এক নয়, কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে দীর্ঘদিনের আলোচনায়ও ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, ঋণ অনুমোদনে স্বার্থের সংঘাত এবং তদারকির ঘাটতিকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ ও ব্যাংক পরিচালনার কাঠামোগত দুর্বলতাকে খেলাপি ঋণের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু নতুন মামলা করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে আদায় পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

ঋণ কেলেঙ্কারি বন্ধে প্রথম প্রয়োজন ঋণ অনুমোদনের সময় প্রকৃত মালিকানা, সংশ্লিষ্ট পক্ষ, জামানতের প্রকৃত মূল্য ও ঋণগ্রহীতার পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই। বড় ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তের পূর্ণ নথি সংরক্ষণ, স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ এবং নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সুযোগ যেন ইচ্ছামতো প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের জন্য ব্যবহার না হয়, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি জরুরি।

অন্যদিকে তদন্ত ও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা হওয়া মানেই তার অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্তে নথি, ব্যাংক হিসাব, ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া, অর্থের গতিপথ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করতে হবে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি এবং রাষ্ট্রের অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মামলার বিষয় নয়। এটি দীর্ঘদিনের ঋণ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক পরিচালনা, নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। একদিকে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক চাপ, অন্যদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের তদন্ত—দুই বাস্তবতাই ব্যাংক খাতে গভীর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখাচ্ছে।

টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫ সাধারণ মানুষের সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতায় দুর্নীতির বিস্তার তুলে ধরেছে। আর চলমান ঋণ কেলেঙ্কারির তদন্ত রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার আরও বড় ঝুঁকি সামনে এনেছে। এখন ঋণখেলাপি ও ঋণ জালিয়াতির বিরুদ্ধে শুধু মামলা নয়, অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামো, ঋণ অনুমোদন, নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং অডিট ব্যবস্থায় কার্যকর সংস্কার জরুরি। কারণ ব্যাংকের অর্থ শেষ পর্যন্ত জনগণের আমানত ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।