নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে উৎপাদিত রসুনের বাজারদর যখন উৎপাদন খরচের তুলনায় কম বলে কৃষকেরা দাবি করছেন, তখন বিদেশ থেকে রসুন আমদানির অনুমতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, এ সময়ে আমদানি করা হলে বাজারে দেশি রসুনের দাম আরও কমে যেতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে লোকসানে পড়বেন কৃষকেরা। অন্যদিকে আমদানির সুযোগে লাভবান হতে পারেন আমদানিকারক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা—এমন আশঙ্কাও করছেন কৃষকেরা। তবে আমদানি ঘিরে সিন্ডিকেট বা বাজার কারসাজির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের চর অনুপনগর ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আনোয়ারুল ইসলাম রসুন আমদানির অনুমতি বা ইমপোর্ট পারমিশন (আইপি) বন্ধ রাখার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে আবেদন করেছেন। গত ৯ আগস্ট দেওয়া আবেদনে তিনি দেশি কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে রসুন আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানান।
আবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের বাজারে দেশি রসুন কেজিপ্রতি প্রায় ৬০ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের দাবি, এ দাম তাঁদের উৎপাদন খরচের তুলনায় কম। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি ও জমি প্রস্তুতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করার পর কম দামে রসুন বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে বর্তমান বাজারদরেও অনেক কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না বলে অভিযোগ করছেন।
কৃষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতিতে বিদেশি রসুন বাজারে প্রবেশ করলে সরবরাহ আরও বেড়ে গিয়ে দেশি রসুনের দাম কমে যেতে পারে। এতে চলতি মৌসুমে কৃষকের লোকসান আরও বাড়ার পাশাপাশি আগামী মৌসুমে রসুন চাষে আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কৃষকদের প্রশ্ন, দেশে উৎপাদিত রসুনের দাম যখন কম এবং উৎপাদনকারীরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, তখন নতুন করে আমদানির প্রয়োজন কতটা রয়েছে।
কৃষকেরা আরও অভিযোগ করছেন, কৃষিপণ্যের বাজারে উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে একাধিক স্তরের ব্যবসায়ী থাকায় অনেক সময় উৎপাদক তাঁর পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি করে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। রসুন আমদানির সুযোগকে কেন্দ্র করে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সক্রিয় হলে প্রান্তিক কৃষকেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে তাঁদের আশঙ্কা।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী, আমদানিকারক বা গোষ্ঠী বাজার কারসাজিতে জড়িত—এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আমদানির অনুমতি, আমদানির পরিমাণ, বাজারদর, দেশীয় উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
আবেদনকারী মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, উৎপাদনের মৌসুমে বিদেশি রসুন আমদানি করা হলে কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হবেন। কৃষকের উৎপাদিত রসুনের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না করে আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে কৃষকেরা রসুন চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। তাঁর মতে, কৃষকের উৎপাদন খরচ ও বর্তমান বাজারদর বিবেচনা করে আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদনের মৌসুমে ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে পরবর্তী মৌসুমে চাষিরা ওই ফসল উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। এতে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। পরে স্থানীয় চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। ফলে স্বল্পমেয়াদে বাজারদর নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
রসুন আমদানির সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি কৃষিপণ্যের বাজারদরের বিষয় নয়। এর সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন খরচ, ন্যায্য মূল্য, বাজার ব্যবস্থাপনা, আমদানি নীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং কৃষির ভবিষ্যৎ জড়িয়ে রয়েছে। দেশি রসুনের দাম কম থাকার সময়ে আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে কৃষকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, তা নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে বাজারে সত্যিই কোনো সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম কারসাজি রয়েছে কি না, থাকলে এর সঙ্গে কারা জড়িত এবং বাজারদর নির্ধারণে তাদের কোনো প্রভাব রয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা প্রয়োজন। উৎপাদক পর্যায়ে দাম, পাইকারি বাজার, খুচরা বাজার এবং আমদানি ব্যয়ের তথ্য পর্যালোচনা করলে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য ব্যবধান থাকলে তার কারণও চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।
চর অনুপনগর ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতা আনোয়ারুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সাময়িকভাবে রসুন আমদানির অনুমতি বন্ধ রাখা এবং দেশি কৃষকের উৎপাদিত রসুনের ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এখন কৃষকেরা সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁদের মূল দাবি, আমদানি নীতি নির্ধারণের সময় শুধু ভোক্তার স্বার্থ নয়, উৎপাদনকারীর স্বার্থও বিবেচনায় নেওয়া হোক। কারণ উৎপাদন খরচের নিচে দীর্ঘদিন পণ্য বিক্রি করতে হলে কৃষকের টিকে থাকা যেমন কঠিন হবে, তেমনি ভবিষ্যতে দেশীয় উৎপাদন কমে গিয়ে আমদানিনির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।