বিশেষ সংবাদ

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২৫০ কোটি টাকার অনিয়ম

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২৫০ কোটি টাকার অনিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে নকশাগত ত্রুটি, দীর্ঘসূত্রতা, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের জটিলতার পাশাপাশি প্রায় ২৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যালোচনায়। টেন্ডার, বিল পরিশোধ, কর কর্তন ও চুক্তি বাস্তবায়ন ঘিরে এসব অনিয়মের অভিযোগ প্রকল্পটির অর্থ ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ২০৯ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রকল্পে সার্ভিস লেন, সেতু, কালভার্ট, ওভারপাস, ইউটার্নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কথা রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে।

২০২১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির নির্ধারিত বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু আইএমইডির পর্যালোচনা অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৮৯ শতাংশ পার হয়ে গেলেও ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে আর্থিক অগ্রগতি ছিল ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। প্রকল্পে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৪২১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আইএমইডির পর্যালোচনায় প্রকল্পের প্রধান সড়কের কাজের অগ্রগতি ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং সার্ভিস লেনের কাজ ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশে আটকে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। সেতুর কাজের অগ্রগতি ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং কালভার্টের কাজ ৫৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ইউটার্ন, গোলচত্বর ও ফুটওভারব্রিজের কিছু কাজ তখনও শুরু হয়নি।

প্রকল্পের ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের জটিলতা চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। প্রয়োজনীয় ৮২৯ দশমিক ৮৩ একর জমির মধ্যে পর্যালোচনার সময় প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল মাত্র ৩১২ দশমিক ১৫ একর, যা মোট প্রয়োজনের ৩৭ দশমিক ৬১ শতাংশ। ফলে অনেক এলাকায় ঠিকাদাররা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জমি হাতে পাননি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইন স্থানান্তরেও ধীরগতি ছিল।

তবে প্রকল্পের সমস্যাকে শুধু ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় সীমাবদ্ধ রাখেনি আইএমইডি। ২০১৯ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ভূতাত্ত্বিক অবস্থা ও বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইনের অবস্থান যথাযথভাবে নির্ধারিত না হওয়ার কারণে বাস্তবায়ন পর্যায়ে নকশা পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দুর্বল মাটি ও কাদাযুক্ত স্তর পাওয়ায় অতিরিক্ত পরীক্ষা, মাটি অপসারণ ও ভূমি উন্নয়নকাজের প্রয়োজন হয়েছে। এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আর্থিক অনিয়মের জায়গাটিই প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। সরকারি ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় প্রায় ২৪৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকার অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতার পরিবর্তে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, কর ও ভ্যাট যথাযথভাবে আদায় না করা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের বিভিন্ন অনিয়ম রয়েছে।

পর্যালোচনায় প্রকৌশলীদের জন্য অস্থায়ী আবাসনের কাজ না করেই ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ, মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ২৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ, ঠিকাদারের বিল থেকে ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ভ্যাট ও আয়কর আদায় না করা এবং অনুমোদন ছাড়া পরিবর্তিত কাজের জন্য ৪৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের তথ্যও উঠে এসেছে। ব্যাংক সুদ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া এবং বাধ্যতামূলক বিমা না নেওয়ার মতো বিষয়ও নিরীক্ষা আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আপত্তির অধিকাংশই পর্যালোচনার সময় নিষ্পত্তি হয়নি।

নির্মাণকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। কয়েকটি অংশে রিজিড পেভমেন্টে ব্যবহৃত কংক্রিটের পরীক্ষায় নকশায় নির্ধারিত মানের তুলনায় কম কমপ্রেসিভ শক্তি পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম, সুরক্ষা ব্যারিয়ার ও সতর্কতামূলক চিহ্ন ব্যবহারের ঘাটতিও চিহ্নিত হয়েছে। ফলে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রকল্পের কাজের মান ও জননিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জনগণের ওপরও। আইএমইডির পর্যালোচনায় ৮৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ স্থানীয় মানুষ নির্মাণকাজের কারণে কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ধুলা, শব্দ, নির্মাণবর্জ্য ও পানি নিষ্কাশন সমস্যায় ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ স্থানীয় বাসিন্দা ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে; পর্যালোচনার সময় ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ ভূমিমালিক ক্ষতিপূরণ পাননি বলে তথ্য পাওয়া যায়।

এডিবির অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই করিডর শুধু রাজধানীর সঙ্গে সিলেটের যোগাযোগ সহজ করার প্রকল্প নয়। এটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি আখাউড়া, শেওলা ও তামাবিল স্থলবন্দর এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ জোরদারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এডিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় ২১০ কিলোমিটার সড়কের সক্ষমতা বাড়িয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্পের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ধীরগতির জন্য ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর, নকশা পরিবর্তন এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব জটিলতার কথা বলা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক এ কে এম ফজলুল করিম জানিয়েছেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ের পরিস্থিতির মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়ায় নকশা সংশোধনসহ অতিরিক্ত কাজের প্রয়োজন হয়েছে। অন্যদিকে আইএমইডি দ্রুত ভূমি হস্তান্তর, ইউটিলিটি স্থানান্তর, নকশা অনুমোদন এবং ঠিকাদারদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—নিরীক্ষা আপত্তি বা আইএমইডির প্রতিবেদনে কোনো অনিয়ম চিহ্নিত হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির দায়ে দোষী প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। টেন্ডার, বিল, কর কর্তন বা চুক্তি বাস্তবায়নে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর প্রশাসনিক ও আইনগত যাচাই প্রয়োজন। দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি, চুক্তির শর্ত, অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য বিবেচনা করতে হবে।

তবে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ২৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি নিরীক্ষা আপত্তি, অত্যন্ত কম বাস্তব অগ্রগতি এবং সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে কাজের বড় অংশ বাকি থাকা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের সতর্কবার্তা। বিশেষ করে যখন প্রকল্পের অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণও রয়েছে, তখন প্রতিটি টাকা কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং নির্ধারিত কাজের বিপরীতে কী ফল পাওয়া যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

আইএমইডি সতর্ক করেছে, দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ভূমি অধিগ্রহণ দ্রুত শেষ করা, ইউটিলিটি স্থানান্তর, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় বাড়ানো, ঠিকাদারের জনবল ও যন্ত্রপাতি বৃদ্ধি এবং নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্পের আর্থিক অনিয়মের নিরীক্ষা আপত্তিগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজন রয়েছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের বর্তমান চিত্র তাই শুধু একটি সড়ক নির্মাণের ধীরগতির গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল সরকারি ও বৈদেশিক অর্থ, টেন্ডার ও বিল ব্যবস্থাপনা, নির্মাণের মান, ভূমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় মানুষের ক্ষতিপূরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে জবাবদিহির প্রশ্ন। অভিযোগ ও নিরীক্ষা আপত্তির নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির পাশাপাশি প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে শেষ করাই এখন সবচেয়ে বড় জনস্বার্থের বিষয়।