জাতীয়

চট্টগ্রাম বিআরটিএতে দালালচক্র, অভিযানেও থামেনি ঘুষ

চট্টগ্রাম বিআরটিএতে দালালচক্র, অভিযানেও থামেনি ঘুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ভ্রাম্যমাণ আদালতের একাধিক অভিযান হলেও সমস্যাটি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মে মাসে চট্টগ্রাম বিআরটিএর বিভাগীয় কার্যালয়ে দালালবিরোধী অভিযানে দুজনকে আটক করে ২১ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে দুদকের অভিযানে গাড়ির নিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ রুট পারমিট দেওয়ার ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে অনিয়ম ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের নথি সংগ্রহ করা হয়।

চট্টগ্রাম বিআরটিএতে দালালদের উপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুদকের একটি দল ছদ্মবেশে সেবাগ্রহীতা হিসেবে কার্যালয়ে গিয়ে দালালদের সক্রিয়তা দেখতে পায়। ওই অভিযানে চারজন দালাল বিআরটিএর তিন কর্মচারীকে আটক করা হয়েছিল। দালালদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।

এর পরও অভিযোগের পুনরাবৃত্তি হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, অভিযান তাৎক্ষণিক শাস্তির পরও দালালচক্র কীভাবে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের মে মাসের দুদক অভিযানে চট্টগ্রামের মেট্রো- সার্কেল, জেলা অফিস বিভাগীয় অফিসে বিভিন্ন সেবা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করা হয়। দুদক গাড়ির নিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ রুট পারমিটের নথি সংগ্রহ করে। ওই সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে দালালের মাধ্যমে কয়েক হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের কথাও উঠে আসে।

বিআরটিএর সেবাগুলোর মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ রুট পারমিট সাধারণ মানুষের জন্য নিয়মিত প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা। এসব সেবা পেতে নির্ধারিত ফি প্রক্রিয়া থাকলেও দালালের মাধ্যমে দ্রুত কাজ করিয়ে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে সরকারি সেবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন যিনি সরাসরি নিয়ম মেনে আবেদন করেন, তিনিও হয়রানি বা বিলম্বের আশঙ্কায় মধ্যস্থতাকারীর দ্বারস্থ হতে পারেন।

এখানেই দালালচক্রের কার্যক্রমের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগের যোগসূত্রের প্রশ্ন আসে। কোনো দালাল একা সরকারি নথি অনুমোদন বা সেবা দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। ফলে দালালের মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘুষ গ্রহণ করেছেন কি না, সেবার ফাইল দ্রুত বা ধীর করার ক্ষেত্রে কার ভূমিকা ছিল এবং অর্থ লেনদেনের কোনো প্রমাণ রয়েছে কি নাএসব বিষয় তদন্তে আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারী অপরাধে জড়িত, এমন সিদ্ধান্তেও যাওয়া যায় না।

২০২৬ সালের মে মাসের অভিযান দেখিয়েছে, দালালবিরোধী তৎপরতা এখনো প্রয়োজন হচ্ছে। ওই অভিযানে চট্টগ্রাম বিআরটিএর বিভাগীয় কার্যালয়ে দুই ব্যক্তিকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত ২১ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়। একই সময়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিআরটিএর চট্টগ্রাম কার্যালয়ে দালালদের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই ধরনের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে দুদকের অভিযানেও সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অভিযোগ নেওয়া হয় এবং বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ নথি সংগ্রহ করা হয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সে সময় চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দালালের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ তদন্তের কথাও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ধরনের অভিযোগের সত্যতা তদন্ত প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারণযোগ্য।

চট্টগ্রাম বিআরটিএর ক্ষেত্রে সমস্যাটি শুধু দালাল উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের একটি অংশ হলো, দালাল ছাড়া কাজ করতে গেলে প্রক্রিয়া জটিল, সময়সাপেক্ষ বা হয়রানিমূলক হয়ে ওঠে। আবার দালালের মাধ্যমে কাজ করলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়এমন অভিযোগও রয়েছে। এই দুই পরিস্থিতির যেকোনো একটি সত্য হলে তা সরকারি সেবা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা সমতার জন্য উদ্বেগের কারণ।

দালালনির্ভরতা কমাতে ডিজিটাল আবেদন অনলাইন সেবা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে যাচাই, পরীক্ষা, অনুমোদন সনদ দেওয়ার প্রতিটি ধাপে কোন কর্মকর্তা কখন ফাইল দেখেছেন, কত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা এবং কেন কোনো আবেদন আটকে আছেএসব তথ্য সহজে জানা গেলে মধ্যস্থতাকারীর সুযোগ কমতে পারে। একই সঙ্গে সেবাগ্রহীতার অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা কার্যকর নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন।

বিআরটিএ কার্যালয়ে নিয়মিত নজরদারি, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, দালালদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারিত ফি সেবার সময় প্রকাশ্যে টানানোর পাশাপাশি অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তিও জরুরি। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে নিরপরাধ কর্মকর্তা-কর্মচারী যাতে শুধু অভিযোগের কারণে সামাজিকভাবে অভিযুক্ত না হন, তদন্তেও সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

চট্টগ্রাম বিআরটিএতে ২০২৪ সালের অভিযান থেকে ২০২৫ সালের দুদক তৎপরতা এবং ২০২৬ সালের দালালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহে একটি বিষয় স্পষ্টদালালচক্রের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন অভিযান হচ্ছে, কিন্তু অভিযোগের পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়নি। ফলে শুধু অভিযান তাৎক্ষণিক শাস্তির পাশাপাশি দালালদের সঙ্গে সরকারি সেবা ব্যবস্থার কোনো অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র থাকলে তা শনাক্ত করে ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন।

সাধারণ মানুষের কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন বা ফিটনেস সনদ কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় সেবা। এই সেবা পেতে কাউকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে কিংবা দালালের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হলে নাগরিকের সমান সেবা পাওয়ার অধিকার প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই চট্টগ্রাম বিআরটিএতে চলমান অভিযানকে শুধু দালাল ধরার কার্যক্রম হিসেবে না দেখে সরকারি সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি সমতা প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে দুদক, বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপই এখন গুরুত্বপূর্ণ। দালাল আটক কারাদণ্ডের পাশাপাশি ঘুষের অর্থের গতিপথ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসূত্র থাকলে তার প্রমাণ অনুসন্ধান করতে হবে। তাহলেই চট্টগ্রাম বিআরটিএতে বারবার ফিরে আসা দালাল ঘুষের অভিযোগের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।