জাতীয়

চবির নিয়োগে অনিয়ম, দুদকের অভিযানে নথি জব্দ

চবির নিয়োগে অনিয়ম, দুদকের অভিযানে নথি জব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে প্রশাসনিক ভবনে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এর একটি এনফোর্সমেন্ট দল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নিয়োগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে নিয়োগ, পদোন্নতি ও স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়া।

দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ১৫ মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সিন্ডিকেট সভায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ, পদোন্নতি এবং চাকরি স্থায়ীকরণের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম, নিয়োগবিধি ও সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে দুদক।

অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬৫তম সিন্ডিকেট সভাকে ঘিরে। ওই সভায় নয়টি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। দুদকের অভিযানে সংগৃহীত প্রাথমিক নথি পর্যালোচনায় অন্তত একটি নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা কমিটির সুপারিশ ছিল না বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া যায়। বিষয়টি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়ম ও প্রশাসনিক ধাপ অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

তবে বিভিন্ন মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় ১৫৩ জন নিয়োগের যে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল, দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সেটিকে সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন। ফলে নিয়োগের প্রকৃত সংখ্যা, কোন সভায় কতজন নিয়োগ পেয়েছেন এবং কোন কোন নিয়োগের ক্ষেত্রে বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে—এসব তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

দুদকের অভিযান পরিচালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে। সহকারী পরিচালক সায়েদ আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের দল ওই কার্যক্রমে অংশ নেয়। দুদক জানিয়েছিল, বিভিন্ন নিয়োগের নথি পর্যালোচনার পাশাপাশি অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযান শেষে সংগৃহীত তথ্য ও নথি বিশ্লেষণ করে কমিশনে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটি, নিয়োগ বোর্ড, সংশ্লিষ্ট অনুষদ এবং সিন্ডিকেটসহ একাধিক পর্যায়ের প্রক্রিয়া থাকে। এসব ধাপের উদ্দেশ্য হলো যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়োগে প্রাধান্য না পাওয়া। কোনো ধাপের সুপারিশ বাদ দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকলে তার বৈধতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া তদন্তের আওতায় আসা স্বাভাবিক।

শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়টিও দুদকের নজরে এসেছে। ফলে তদন্তের পরিধি শুধু একটি বা কয়েকটি শিক্ষক নিয়োগে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রশাসনিক নিয়োগব্যবস্থার সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় বিস্তৃত হতে পারে। কোন পদে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল, কতজন আবেদন করেছিলেন, যোগ্যতার শর্ত কী ছিল, নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশ কী ছিল এবং শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেট কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এসব নথির তুলনামূলক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ সাধারণত শুধু ব্যক্তিগত সুবিধা দেওয়ার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মান, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতাও যুক্ত। যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাব বা অন্য কোনো অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ হয়ে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব পড়ে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে নির্দোষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জনমনে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তিও দূর করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ নিয়ে দুদকের অভিযানকে ঘিরে পরে প্রশাসনের সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের বিরোধও সামনে আসে। নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার পদত্যাগের দাবিতে কর্মসূচিও হয়েছিল। এসব অভিযোগের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক ব্যাখ্যার বাইরে নিয়োগের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নথি ও বিধিমালার আলোকে যাচাই করাই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তদন্তে তাই শুধু নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা নয়, নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি দেখা প্রয়োজন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে আবেদন যাচাই, লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা, নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশ, বিভাগীয় কমিটির মতামত এবং সিন্ডিকেটের অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের নথি মিলিয়ে দেখলে অনিয়মের প্রকৃতি স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো প্রার্থীকে নিয়মের বাইরে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণেও এসব নথি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—দুদকের অভিযানে কোনো নথি সংগ্রহ বা কোনো ব্যক্তির নাম তদন্তে আসা মানেই তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় তা প্রমাণিত হতে হবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের অর্থ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থ ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সরকারি অর্থ ও ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইন, বিধি ও জবাবদিহিও সমানভাবে প্রয়োজন।

দুদকের অভিযান তাই একটি নির্দিষ্ট সময়ের নিয়োগ-অনিয়মের অভিযোগ যাচাইয়ের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। তদন্তে যদি বিধিবহির্ভূত নিয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অন্য কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় কীভাবে ত্রুটি তৈরি হয়েছিল, সেটিও চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

আর যদি অভিযোগের সব বা কোনো অংশ প্রমাণিত না হয়, তাহলে তদন্তের ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থানও পরিষ্কার করা জরুরি। কারণ নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সন্দেহও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ-সংক্রান্ত এই তদন্ত শেষ পর্যন্ত শুধু কতজন নিয়োগ পেয়েছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে না; বরং নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি কতটা মানা হয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার কী ভূমিকা ছিল এবং কোনো প্রার্থী বা গোষ্ঠী নিয়মবহির্ভূত সুবিধা পেয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট করবে। দুদকের সংগৃহীত নথি ও পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদনেই এখন নির্ধারিত হবে অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি কতটা এবং জবাবদিহির প্রয়োজন কোথায়।