জাতীয়

ভারতীয় নাগরিককে এনআইডি : নির্বাচন কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যান ও সেনাসদস্যর বিরুদ্ধে মামলা

ভারতীয় নাগরিককে এনআইডি : নির্বাচন কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যান ও সেনাসদস্যর বিরুদ্ধে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জালিয়াতির অভিযোগে বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা দিলীপ কুমার হাওলাদারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে মামলার ঘটনাটি তাঁর বরিশালে বর্তমান দায়িত্ব পালনের সময়ের নয়। তিনি এর আগে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ওই এনআইডি ইস্যু করা হয়েছিল বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৩ মে বাগেরহাট দুদক কার্যালয়ে মামলাটি করা হয়।

মামলায় দিলীপ কুমার হাওলাদারের সঙ্গে চিতলমারী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ নিজাম উদ্দিন এবং চিতলমারীর আড়ুয়াবর্ণি গ্রামের সাবেক সেনাসদস্য মো. মোশাররফ হোসেন মোল্লাকে আসামি করা হয়েছে। দুদকের অভিযোগ, তাঁরা পরস্পরের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিধিবহির্ভূতভাবে এনআইডি তৈরিতে সহায়তা করেছেন। মামলাটি দণ্ডবিধির প্রতারণা ও জালিয়াতিসংক্রান্ত ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ফণিভূষণ ওরফে মনি মণ্ডল এবং প্রতুল চন্দ্র মণ্ডল নামে দুই সহোদর ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের বাগেরহাটের চিতলমারী থেকে জন্মনিবন্ধন সনদ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির উদ্দেশ্যে দেশে আনার পর ২০১৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর ইউনিয়ন পরিষদে জন্মনিবন্ধনের আবেদন করা হয়েছিল বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁদের জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়। পরে ওই নথির ভিত্তিতে এনআইডির জন্য আবেদন করা হয়।

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের একজন ফণিভূষণ মণ্ডলের নামে পরে এনআইডি ইস্যু করা হয়। অনুসন্ধানে ওই এনআইডির তথ্যের সঙ্গে জন্মনিবন্ধন, ভোটার নিবন্ধন ফরম ও অন্যান্য তথ্যের অসঙ্গতি পাওয়া যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি ভোটার নিবন্ধন ফরমে ব্যবহৃত শনাক্তকারীর পরিচয় ও স্বাক্ষর নিয়েও জালিয়াতির অভিযোগ উঠে এসেছে। তাঁর দেওয়া ঠিকানায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অস্তিত্বও তদন্তে পাওয়া যায়নি বলে দুদক জানিয়েছে।

মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তৈরি করা এনআইডি ব্যবহার করে ফণিভূষণকে সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে দাতা হিসেবে দেখানো হয়েছিল। ফলে বিষয়টি শুধু একটি পরিচয়পত্র তৈরির অনিয়মের অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর সঙ্গে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিষয়ও যুক্ত হয়েছে। এনআইডি ব্যবস্থার তথ্য ব্যবহার করে জমি বা অন্যান্য সম্পদের মালিকানা পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হলে তা জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং ভূমি মালিকানা উভয়ের জন্যই গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দিলীপ কুমার হাওলাদারকে মামলায় আসামি করার ক্ষেত্রে তাঁর বর্তমান পদ নয়, ঘটনাকালের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা থাকার সময় সংশ্লিষ্ট এনআইডি ইস্যু হয়েছিল বলে দুদক জানিয়েছে। বর্তমানে তিনি বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে মামলার সময়ের সংবাদে উল্লেখ করা হয়।

ঘটনাটি জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনায় যাচাই-বাছাই ও দায়িত্বশীলতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। একজন ব্যক্তির নাগরিকত্ব, জন্মনিবন্ধন, ঠিকানা, শনাক্তকারী এবং অন্যান্য পরিচয়-তথ্য যাচাইয়ের পর এনআইডি তৈরির কথা। সেই প্রক্রিয়ার কোনো ধাপে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য গ্রহণ, নথি জাল বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়ে থাকলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত সুবিধা তৈরি করে না; রাষ্ট্রীয় পরিচয় ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তবে মামলা হওয়া মানেই কোনো আসামির অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। দুদকের অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ সব আসামির আইনগত অধিকার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। ফলে তদন্ত ও বিচার শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত না করাই ন্যায়সংগত।

এ ঘটনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এনআইডি ও ভূমি মালিকানা ব্যবস্থার মধ্যে সম্ভাব্য অপব্যবহারের ঝুঁকি। কোনো বিদেশি নাগরিক যদি জাল বা বিধিবহির্ভূত নথির মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকের পরিচয় গ্রহণ করেন এবং সেই পরিচয় ব্যবহার করে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ পান, তাহলে এর প্রভাব ব্যক্তিগত ক্ষতির বাইরে জাতীয় নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার এবং প্রশাসনিক তথ্যব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।

বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাগেরহাটের পুরোনো দায়িত্বকালীন ঘটনায় এ মামলা হওয়ায় নির্বাচন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত অভিযোগে তদন্ত ও মামলা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্বকাল, অনুমোদনের ধাপ এবং কোন পর্যায়ে কীভাবে তথ্য যাচাই করা হয়েছিল—এসব নথিভিত্তিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

দুদকের এই মামলা তাই শুধু একজন নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নয়; জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় তথ্য যাচাই, কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং পরিচয়পত্রকে ব্যবহার করে সম্পত্তি হস্তান্তরের সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ও সামনে এনেছে। তদন্তে অভিযোগের পূর্ণ সত্য উদঘাটন এবং আদালতের মাধ্যমে দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম ঠেকাতে এনআইডি যাচাই ব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করার প্রয়োজন রয়েছে।