নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
বরিশালে সরকারি ত্রাণ বিতরণ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ ত্রাণ সঠিকভাবে বিতরণ না করা, সুবিধাভোগীর তালিকা তৈরিতে পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। একই সঙ্গে নগর ও স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়নকাজে দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তও হয়েছে। ফলে সরকারি অর্থ ও সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বরিশাল জেলা প্রশাসনের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, টিআর ও কাবিখা, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং ভিজিএফসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালিত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এবং দরিদ্র ও অসহায় পরিবারকে খাদ্য, অর্থসহায়তা ও অন্যান্য উপকরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে বরিশাল জেলার বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৬৪টি পরিবারের মধ্যে ১২৮ বান্ডিল ঢেউটিন এবং পরিবারপ্রতি ৬ হাজার টাকা করে মোট ৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়। অর্থাৎ নির্ধারিত তালিকা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তবে অতীতে বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ নিয়ে ভিন্ন চিত্রের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ত্রাণ দেওয়া, প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দেওয়া, সুবিধাভোগীর তালিকায় স্বজনপ্রীতি এবং বরাদ্দকৃত সামগ্রী ওজনে কম দেওয়ার মতো অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এসব অভিযোগের সবগুলো যে প্রমাণিত, তা নয়; তবে সরকারি ত্রাণের তালিকা প্রণয়ন ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা এসব ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে।
ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে। দুর্যোগের পর একটি পরিবার যখন খাদ্য, নগদ অর্থ, ঢেউটিন বা অন্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকে, তখন তালিকা থেকে বাদ পড়া কিংবা বরাদ্দের অংশ কম পাওয়া তাদের জন্য সরাসরি আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সুবিধা বণ্টনের অভিযোগ সত্য হলে সরকারি সহায়তার ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
অন্যদিকে বরিশালের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সরকারি তদন্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন দপ্তরের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে দুদক সাবেক সচিবসহ ১৮ কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ তলব করে। এর আগে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন দপ্তরের ১২ কর্মকর্তাকে দুদকের নজরদারিতে রাখার তথ্যও প্রকাশিত হয়।
বিশেষ করে উন্নয়ন বরাদ্দের বড় অংশ প্রকৌশল শাখার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ায় প্রকল্পের নকশা, দরপত্র, ঠিকাদার নির্বাচন, কাজের পরিমাণ, কাজের মান এবং বিল পরিশোধের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে প্রকল্পের নথি, পরিমাপ বই, কার্যাদেশ, বিল এবং বাস্তব কাজ সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ত্রাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে অনিয়মের ধরন এক নয়। ত্রাণ বিতরণে মূল প্রশ্ন থাকে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন, বরাদ্দের পরিমাণ ও সঠিক সময়ে বিতরণ নিয়ে। আর উন্নয়ন প্রকল্পে প্রশ্ন ওঠে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, কাজের মান, ব্যয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে। তাই দুই ক্ষেত্রেই আলাদা নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সরকারি সহায়তা ও প্রকল্পের অর্থ জনগণের অর্থ। ফলে বরিশালে ত্রাণের তালিকা প্রকাশ, সুবিধাভোগীদের যাচাই, বিতরণের পরিমাণ ও সময়ের তথ্য সংরক্ষণ এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ সহজ করা প্রয়োজন। একইভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, কাজের অগ্রগতি এবং সম্পন্ন কাজের মান সম্পর্কে জনসাধারণের জানার সুযোগ থাকলে অনিয়মের ঝুঁকি কমতে পারে।
তবে কোনো কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার বা অন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেই তা অপরাধ হিসেবে ধরে নেওয়া আইনসম্মত নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফলই চূড়ান্ত বিবেচনার ভিত্তি হওয়া উচিত।
বরিশালের ত্রাণ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় তাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো বরাদ্দ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তা যেমন রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত থাকা প্রয়োজন, তেমনি উন্নয়ন প্রকল্পেও সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার ব্যবহার যাচাইযোগ্য হওয়া দরকার।
ত্রাণের অর্থ ও প্রকল্পের বরাদ্দ সঠিক মানুষের কাছে এবং নির্ধারিত কাজে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট, সরেজমিন পরিদর্শন, ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্ট করার মধ্য দিয়েই বরিশালে সরকারি অর্থ ও সহায়তা ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।