জাতীয়

সাবেক ডিআইজি বাতেনের সম্পদ অনুসন্ধান থেকে মামলা

সাবেক ডিআইজি বাতেনের সম্পদ অনুসন্ধান থেকে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

 

রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আব্দুল বাতেনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত মামলায় গড়িয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে তাঁর নামে কোটি ২৯ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য এবং সাতটি ব্যাংক হিসাবে ১৩ কোটি ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫১১ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী নূর জাহান আক্তার হীরার বিরুদ্ধেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ সন্দেহজনক লেনদেনের পৃথক অভিযোগে মামলা হয়েছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আব্দুল বাতেনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু হয়। এর আগে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর সম্পদ নিয়ে অভিযোগ প্রকাশিত হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁকে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি পদ থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল।

অনুসন্ধানের পর ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ দুদক আব্দুল বাতেন তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করে। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, আব্দুল বাতেনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত কোটি ২৯ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৪ টাকার সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি সাতটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ১৩ কোটি ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫১১ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়।

অন্য মামলায় তাঁর স্ত্রী নূর জাহান আক্তার হীরার বিরুদ্ধে ৮৫ লাখ ৪১ হাজার ৮০৮ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর নামে থাকা চারটি ব্যাংক হিসাবে কোটি ৭৪ লাখ ৩২ হাজার ৭০২ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। দুদকের অভিযোগে ওই মামলায় আব্দুল বাতেনকেও আসামি করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান মামলার আগে থেকেই আব্দুল বাতেনের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের তথ্য প্রকাশিত হয়। পরে আদালতের আদেশে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়াও শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আদালত তাঁর সম্পদ জব্দের আদেশ দেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আব্দুল বাতেন পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান পরবর্তী মামলার ঘটনা সরকারি বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ সাবেক কর্মকর্তার সম্পদের উৎস, ব্যাংক লেনদেন এবং দায়িত্ব পালনকালে অর্জিত সম্পদের সঙ্গে ঘোষিত আয়ের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্নের বিষয়টি সামনে এনেছে।

তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান, মামলা বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগকে আদালতে অপরাধ প্রমাণের সমতুল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আব্দুল বাতেন তাঁর স্ত্রী আইনগতভাবে নিজেদের বক্তব্য আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রাখেন। একইভাবে সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগের প্রকৃতি, অর্থের উৎস ব্যবহারের বিষয়ে তদন্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণ উপস্থাপনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে।

এই মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাংক লেনদেন। দুদক শুধু সম্পদের পরিমাণ নয়, একাধিক ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বড় অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগও এনেছে। ফলে তদন্তে অর্থের উৎস, লেনদেনের উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সম্পদ অর্জনের অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব, আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য এবং ব্যাংক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সম্পদ বিবরণী যাচাই, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ এবং অভিযোগের দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে।

আব্দুল বাতেনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান থেকে মামলা এবং সম্পদ জব্দের এই ধারাবাহিকতা তাই শুধু একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে আইনি প্রক্রিয়া নয়; সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পদ অর্জন আর্থিক লেনদেনের ওপর কার্যকর নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। এখন মামলার তদন্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।