অপরাধ

বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, শেল্টারদাতা ‘বড়ভাই’ কারা?

বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, শেল্টারদাতা ‘বড়ভাই’ কারা?

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে একাধিক কিশোর অপরাধীকে গ্রেফতার করলেও গ্যাংগুলোর মূল নিয়ন্ত্রক বা গডফাদাররা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে। তবে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইন্ধনদাতাদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খুলনা: 'বড়ভাই'দের আশ্রয়ে দানব হয়ে উঠছে তরুণরা

খুলনা মহানগরীতে পাড়া-মহল্লায় অপরাধ চক্রের বিস্তার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্নবিত্ত পরিবার কিংবা স্কুল থেকে ঝরে পড়া কিশোরদের ব্যবহার করে গড়ে তোলা হচ্ছে একের পর এক ছোট অপরাধী গ্রুপ। সম্প্রতি এক নারীকে ডিম ছুড়ে মেরে মনোযোগ ঘুরিয়ে টাকা ছিনতাই করতে গিয়ে ১২-১৩ বছরের এক কিশোরী ধরা পড়ে। গত ১৯ আগস্ট লবণচরায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে খুন হওয়া দুই তরুণের ঘটনাতেও ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সি কিশোরদের সম্পৃক্ততা পায় পুলিশ।

গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যানুযায়ী, খুলনায় বর্তমানে ৫টি প্রধান কিশোর গ্যাং চরম সক্রিয়:

  • টিপসি বয়েজ: বয়রা পালপাড়া এলাকায় সক্রিয় এই গ্রুপটির অধিকাংশ সদস্য বস্তির। তারা মূলত মাদক সেবন ও বিক্রির সাথে সরাসরি যুক্ত।

  • গোল্ডেন বয়েজ ও ডেঞ্জার বয়েজ: বৈকালী বাজারকেন্দ্রীক এই দুটি গ্রুপের একটিতে স্কুলপড়ুয়া এবং অন্যটিতে অপেক্ষাকৃত বয়সে বড় কিশোরদের তৎপরতা রয়েছে।

  • কিং অব রূপসা: রূপসা এলাকায় শাহীন, নাসির ও অপুর নেতৃত্বে এই গ্যাংটি মহড়া ও আধিপত্য বিস্তার করে থাকে।

  • টাইগার টিম: বিদেশে অবস্থানরত কুখ্যাত সন্ত্রাসী জ্যামির নির্দেশে পরিচালিত এই বাহিনী অস্ত্র প্রদর্শন, মহড়া এবং জমি-ঘের দখলসহ নানা খুনের ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৯টি শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনী (যেমন: গ্রেনেড বাবুর 'বি কোম্পানি', পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী) মাঠপর্যায়ে অপরাধ সংঘটনে কিশোরদের হাতে অস্ত্র ও মাদক তুলে দিচ্ছে।

কুমিল্লা: অভিভাবক বদলালেও কমেনি দাপট

কুমিল্লায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে শীর্ষ কিশোর গ্যাংগুলোর ওপর ক্ষমতাসীনদের ‘ছায়া’ বদলালেও তাদের দৌরাত্ম্য বিন্দুমাত্র কমেনি। আগে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘রাও’ ও ‘ক্রাইম সেটআপ’সহ প্রায় অর্ধশতাধিক গ্যাং এখন মহানগর ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার আশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি 'রাও' গ্যাংয়ের প্রধান ও ৯ মামলার আসামি ইমরান হোসেন রতনকে এক ছাত্রদল নেতার মিছিলে দেখা যাওয়ার পর চরম তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে 'ক্রাইম সেটআপ' গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ছেলেকে নৃশংসভাবে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

গত শুক্রবার রাতে কক্সবাজার থেকে 'রাও' ও 'ক্রাইম সেটআপ'-এর দুই মূল প্রধানসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। এছাড়া গত ১০ দিনে কুমিল্লার ১৮টি থানায় পরিচালিত বিশেষ যৌথ অভিযানে প্রায় ২ হাজার সন্দেহভাজনকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম: তালিকা করেও নিয়ন্ত্রণে হিমশিম পুলিশ

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের কারণে গত কয়েক বছরে ৩৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে এবং অন্যান্য অপরাধ রেকর্ড হয়েছে ছয় শতাধিক। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও সাবেক এমপিদের অনুসারী কিশোর গ্যাং সদস্যরা এখন ভোল পালটে স্থানীয় যুবদল নেতাদের মিছিল-সমাবেশে অংশ নিয়ে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করার চেষ্টা করছে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) তালিকায় নগরীর ১৫টি গ্যাং সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • খুলশী এলাকা: ৫জি (5G) ও ৭জি (7G)

  • চকবাজার এলাকা: ৭ বয়েজ ও কিউট বয়েজ

  • অন্যান্য এলাকা: এমবিএস (MBS), কেবি, এনএস, ৯৯৯, এক্স-মার্ক, ব্যাকহোল, ডট গ্যাং, বিসু, পাইথন, সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার।

চট্টগ্রামে কুপিয়ে হাত বিচ্ছিন্ন করা, প্রকাশ্য গোলাগুলি থেকে শুরু করে বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার্থী সাজিদ হত্যা ও সম্প্রতি খুলশীতে ছুরিকাঘাতে কিশোর খুনের ঘটনায় গ্যাং সদস্যদের সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ মিলেছে।

প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি

পুলিশ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রশ্রয় বন্ধ না হলে শুধু অভিযান চালিয়ে কিশোর অপরাধীদের থামানো সম্ভব নয়। কেএমপি ও সিএমপি পুলিশ কমিশনাররা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, কিশোর গ্যাং দমন ও নেপথ্যের ইন্ধনদাতাদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি সন্তানদের অপরাধমূলক পথ থেকে ফেরাতে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।