নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাই আন্দোলনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলায় আহত হওয়ার অভিযোগে করা একটি মামলার তদন্তে ভিন্ন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার বাদী জাফর আহমেদ আন্দোলনে আহত হননি; বরং ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন তিনি।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, পারিবারিক মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে শিক্ষক, কর্মচারী ও এলাকার বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে; মামলার বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা
২০২৫ সালের ১৫ মার্চ আদালতে মামলাটি করেন জাফর আহমেদ। এজাহারে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের অধিকাংশের বাড়ি মাদারীপুরের শিবচর এলাকায়।
মামলার অভিযোগে জাফর আহমেদ দাবি করেন, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন তিনি। এ সময় পুলিশের গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর তাঁকে আবারও মারধর করা হয়। এতে তিনি জ্ঞান হারান এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়।
এজাহারে আসামিদের নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করা হয়।
তদন্তে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার তথ্য
মামলার তদন্ত শেষে গত ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আকরামুজ্জামান জানান, তদন্তে জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বিজয় সরণি মোড়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হন জাফর আহমেদ। দুর্ঘটনার পর তিনি এক পরিচিতজনকে ফোন করে মোটরসাইকেলটি বাসায় পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
পুলিশ জানায়, হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র এবং জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত গেজেট পর্যালোচনা করেও তাঁর আন্দোলনে আহত হওয়ার দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তে আরও বলা হয়, এজাহারে উল্লেখ করা সময়ে আসামিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।
পারিবারিক মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাফর আহমেদের বাবা ১৯৭০ সালে মাদারীপুরের শিবচরে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে জাফর আহমেদের সঙ্গে তাঁর মা, বড় ভাই ও শিক্ষকদের বিরোধ তৈরি হয়।
একপর্যায়ে স্বজন ও স্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর বিরোধ আরও তীব্র হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসার ওপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং বিরোধীদের হয়রানি করার উদ্দেশ্যে জুলাই আন্দোলনে হামলার অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছিল।
শিক্ষকের দাবি, দুর্ঘটনার পর বাদীকে সহায়তা করেছিলেন তাঁরা
মামলার ৪ নম্বর আসামি ও মাদ্রাসার শিক্ষক হেলাল উদ্দিন জানান, তাঁরা জাফর আহমেদের বাবার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। তাঁর দাবি, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর জাফর আহমেদ হুইলচেয়ারে করে মাদ্রাসায় এলে তাঁরা তাঁকে ধরে দোতলায় তুলে দেন।
হেলাল উদ্দিন অভিযোগ করেন, ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। এতে তাঁরা হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ পুলিশের
তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে তাঁদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আগামী ২ নভেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন। ওই শুনানিতে তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হতে পারে।




