ক্রীড়া প্রতিবেদক:
শুরুটা ছিল হতাশার, এরপর ঘুরে দাঁড়িয়ে টানা দুই জয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ এমার্জিং দল। দক্ষিণ আফ্রিকায় চলমান ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজে শুক্রবার (৭ আগস্ট) ইউএসএসএকে ৭ উইকেটে হারিয়ে শিরোপার লড়াইয়ে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। ফাইনাল নিশ্চিত হলেও লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা এমার্জিংয়ের মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। আগামী ১২ আগস্ট প্রিটোরিয়ার টাক্স ওভালেই অনুষ্ঠিত হবে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল।
সিরিজের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকা এমার্জিংয়ের বিপক্ষে ৭ উইকেটের বড় হার দিয়ে অভিযান শুরু করেছিল বাংলাদেশ। মাত্র ৮৯ রানে অলআউট হয়ে সেই ম্যাচে ব্যাটিং ব্যর্থতার কঠিন বার্তা পেয়েছিল দলটি। তবে প্রথম ম্যাচের ধাক্কা সামলে দ্বিতীয় ম্যাচেই ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ইউএসএসএকে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে ২৬ রানে হারিয়ে প্রথম জয় তুলে নেয় তারা।
এরপর শুক্রবার একই প্রতিপক্ষ ইউএসএসএর বিপক্ষে আরও পরিণত ক্রিকেট উপহার দেয় বাংলাদেশ। সেঞ্চুরিয়নের আইরিন কান্ট্রি ক্লাবে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করে বোলাররা। বাংলাদেশের পেসার চৌধুরী রিজওয়ান ২৮ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ইউএসএসএর ব্যাটিংয়ে বড় ধস নামান। রোহনাত দৌল্লাহ বর্ষণ ও আমিনুল ইসলাম বিপ্লব নেন দুটি করে উইকেট। ফলে ৩৩.৫ ওভারে ১৬৬ রানেই গুটিয়ে যায় ইউএসএসএ।
ইউএসএসএর ইনিংসে শুরুতে অবশ্য বড় জুটি গড়ে উঠেছিল। ডেভিড টিগার ৫৭ বলে ৭২ রান করেন। লুডভিচ শুল্ড ৫৭ বলে করেন ৫১ রান। দ্বিতীয় উইকেটে তাঁদের ১১৯ রানের জুটি ইউএসএসএকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু জুটি ভাঙার পরই দ্রুত বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। মাত্র ৪০ রানের মধ্যে শেষ ৯ উইকেট হারিয়ে ১৬৬ রানে থামে ইউএসএসএর ইনিংস।
জয়ের জন্য ১৬৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশও শুরুতে কিছুটা চাপে পড়ে। দ্রুত দুই ওপেনারকে হারায় দলটি। তবে এরপর অধিনায়ক শাহাদাত হোসেন দীপু ও ইরফান শুক্কুরের ব্যাটে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে বাংলাদেশের হাতে। দীপু ৫৬ বলে অপরাজিত ৭৩ রান করেন। ইরফান শুক্কুর ৩৯ বলে অপরাজিত থাকেন ৫৮ রানে। তাঁদের অবিচ্ছিন্ন ব্যাটিংয়ে মাত্র ২১.৫ ওভারেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।
দুই ব্যাটারের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং বাংলাদেশের রান তাড়াকে সহজ করে দেয়। শুরুতে দুই উইকেট হারানোর পরও কোনো ধরনের আতঙ্কে না গিয়ে তাঁরা দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি ইনিংসকে স্থিতিশীল করেন। ফলে ১৬৭ রানের লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেট হাতে রেখেই পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। এই জয়ই নিশ্চিত করে ফাইনালের জায়গা।
এর আগে দ্বিতীয় ম্যাচেও ইউএসএসএর বিপক্ষে বাংলাদেশ ২৬ রানে জয় পেয়েছিল। ওই ম্যাচটি ৪৭ ওভারে নেমে আসার পর বাংলাদেশ প্রথমে বোলিং করে ইউএসএসএকে ২৪৮ রানে আটকে দেয়। পেসার ইকবাল হাসান ইমন ৫৩ রানে ৫ উইকেট নিয়ে বল হাতে নেতৃত্ব দেন। রোহনাত দৌল্লাহ বর্ষণ নেন দুটি উইকেট। ইউএসএসএর হয়ে জেসন মুইরহেড ৭৯ ও লুডভিচ শুল্ড ৭২ রান করেছিলেন।
জবাবে বাংলাদেশ ৮০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়লেও ইফতেখার হোসেন ইফতি ও মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনের ১০৬ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইফতি ৭১ রানে অপরাজিত ছিলেন, অঙ্কনের ব্যাট থেকে আসে অপরাজিত ৩৭ রান। বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হয়ে গেলে ৩৬ ওভারে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ১৮৬ রান। পরে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে ২৬ রানে জয়ী ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশকে।
ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর এখন বাংলাদেশের সামনে লিগ পর্বের শেষ পরীক্ষা। আগামী ১০ আগস্ট প্রিটোরিয়ার টাক্স ওভালে দক্ষিণ আফ্রিকা এমার্জিংয়ের বিপক্ষে খেলবে তারা। মজার বিষয়, ১২ আগস্ট একই মাঠেই হবে ফাইনাল। ফলে শেষ লিগ ম্যাচটি দুই দলের জন্য শুধু পয়েন্টের হিসাব নয়; সম্ভাব্য ফাইনালের আগে একে অপরের শক্তি ও দুর্বলতা যাচাইয়েরও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
ত্রিদেশীয় সিরিজের সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমার্জিং, দক্ষিণ আফ্রিকা এমার্জিং ও ইউনিভার্সিটি স্পোর্ট সাউথ আফ্রিকা—এই তিন দল ডাবল রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে একে অপরের বিপক্ষে দুবার করে খেলছে। লিগ পর্ব শেষে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দুই দল ফাইনালে মুখোমুখি হবে। ১২ আগস্ট টাক্স ওভালে নির্ধারিত সেই ফাইনালের একটি জায়গা ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ।
এই সফরটি বাংলাদেশের উদীয়মান ক্রিকেটারদের জন্য জাতীয় দলের দরজা খোলার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ এমার্জিং দলে থাকা একাধিক ক্রিকেটার সাম্প্রতিক সময়ে নজর কেড়েছেন। দলে রয়েছেন জাকির হাসান ও মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনের মতো ক্রিকেটার, যারা ইতোমধ্যে জাতীয় দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। ফর্মের কারণে জাতীয় দলের বাইরে থাকা এই ক্রিকেটারদের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা সফর নিজেদের আবারও প্রমাণ করার সুযোগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের ঘোষিত দলে জাকির হাসান, মাহফিজুল ইসলাম, ইফতেখার হোসেন ইফতি, শাহাদাত হোসেন, সামিউন বাসির রাতুল, মইন খান, রোহনাত দৌল্লাহ বর্ষণ, এনামুল হক, ইরফান শুক্কুর, মাহিদুল ইসলাম ভুইয়া অঙ্কন, ইকবাল হাসান ইমন, চৌধুরী মো. রিজওয়ান, আবু হাসিম, হাবিবুর রহমান ও আমিনুল ইসলাম বিপ্লব রয়েছেন।
সফরের শুরুতে ৮৯ রানে অলআউট হয়ে যে দলটি বড় ধাক্কা খেয়েছিল, তারাই পরের দুই ম্যাচে নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য দেখিয়েছে। বোলিংয়ে ইমন, রিজওয়ান, বর্ষণ ও বিপ্লবের কার্যকর পারফরম্যান্স যেমন দলকে ম্যাচে ফিরিয়েছে, তেমনি ব্যাট হাতে দীপু, ইফতি ও ইরফান শুক্কুরের পারফরম্যান্স দলকে চাপের পরিস্থিতি সামলাতে সহায়তা করেছে।
ফাইনালের আগে দক্ষিণ আফ্রিকা এমার্জিংয়ের বিপক্ষে শেষ লিগ ম্যাচটি তাই বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। প্রতিপক্ষ দলটিই টুর্নামেন্টের শুরুতে বাংলাদেশকে ৭ উইকেটে হারিয়েছিল। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ মাত্র ৮৯ রানে গুটিয়ে যাওয়ায় প্রতিশোধের পাশাপাশি নিজেদের উন্নতির প্রমাণ দেওয়ার সুযোগও পাচ্ছে তারা।
সব মিলিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের যাত্রা এখন নতুন মোড় নিয়েছে। প্রথম ম্যাচের বড় পরাজয় পেছনে ফেলে পরপর দুই জয়ে ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে দলটি। সামনে দক্ষিণ আফ্রিকা এমার্জিংয়ের বিপক্ষে শেষ লিগ ম্যাচ, এরপর ১২ আগস্ট একই মাঠে শিরোপার লড়াই। এখন প্রশ্ন একটাই—প্রথম ম্যাচের সেই ব্যর্থতার প্রতিপক্ষকেই কি ফাইনালের মঞ্চে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তুলতে পারবে বাংলাদেশ এমার্জিং?




