ক্রীড়া প্রতিবেদক:
দেশে ফিরতে চান সাকিব আল হাসান। ফিরেই মুখোমুখি হতে চান তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার। তবে সেই ফেরার পথে তাঁর প্রধান শর্ত—সরকারকে তাঁর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। অন্যদিকে সরকার বলছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর সাকিবের জন্য আর আগের মতো নমনীয়তার সুযোগ নেই। ফলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত তারকার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
শুক্রবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাকিব বলেন, সরকার যদি তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশে ফেরার ছাড়পত্র দেয়, তাহলে তিনি ফিরে গিয়ে আদালতের বিচার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। শ্রীলঙ্কা থেকে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সব আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে তাঁর আপত্তি নেই। একই সঙ্গে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
৩৯ বছর বয়সী সাকিব বর্তমানে বিদেশে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলছেন। তিনি দ্রুত দেশে ফিরতে চান এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার আগে দেশের মাটিতে একটি বিদায়ী সিরিজ খেলার আশা করছেন। পাশাপাশি আগামী বছরের আইসিসি পুরুষ ওয়ানডে বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের হয়ে খেলার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সাকিবের দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি জটিলতা। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মামলা সক্রিয় রয়েছে—একটি জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর আন্দোলনের সময় একজন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার অভিযোগসংক্রান্ত এবং অন্যটি দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষের করা মামলা। তাঁর দাবি, হত্যার মামলাটি যে দিনে ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, সেদিন তিনি কানাডার টরন্টোতে ক্রিকেট খেলছিলেন। মামলাটিকে তিনি ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন এবং জানিয়েছেন, এখনো তিনি কোনো আইনজীবী নিয়োগ করেননি।
দেশে ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নটি সাকিবের জন্য নতুন নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিকে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে তিনি দেশে ফেরার উদ্দেশে বিমানে উঠেছিলেন। কিন্তু মাঝপথে তাঁকে ফিরে যেতে বলা হয়। পরে দুবাই থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। তাঁর দাবি, পরবর্তী আরেকটি ফেরার পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়।
সাকিব আরও জানান, আগের সরকারের সময়ে তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র, আইন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পুলিশকে তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য, এসব অভিযোগকে তিনি সাজানো বা ভিত্তিহীন মনে করেন এবং সে বিষয়ে কোনো কার্যকর জবাব পাননি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিচারিক সত্যতা এখনো আদালতের প্রক্রিয়ার বিষয়।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। গত বুধবার নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনাকে ঘিরে আয়োজিত একটি ভার্চুয়াল মিডিয়া অনুষ্ঠানে সাকিবও অংশ নেন। এর পরদিন তাঁর মাগুরার পরিত্যক্ত বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাড়িটির জানালা ভাঙচুর করে এবং পেট্রোল বোমা সদৃশ বস্তু নিক্ষেপ করে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে সময় বাড়িটি খালি থাকায় কেউ হতাহত হননি।
সাকিব ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তেরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, তিনি সেখানে শান্তি ও বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা বলেছেন এবং এ বিষয়ে তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো ইঙ্গিত দেননি।
এ অবস্থায় সরকারের অবস্থানও কঠোর হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক শুক্রবার বলেন, সরকার আগে সাকিবের বিষয়টি ‘যথেষ্ট নমনীয়তা ও সহনশীলতার’ সঙ্গে দেখছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে সাম্প্রতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর সেই অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, হাসিনার সঙ্গে একই মঞ্চে অংশ নেওয়া ব্যক্তির দেশে ফেরার বিষয়ে এখন আর আগের মতো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের হয়ে সাকিবের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার সম্ভাবনাও নাকচ করে দেন।
তবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে সাকিবের চাওয়া সরাসরি সাংঘর্ষিক। সাকিব চান দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে এবং সুযোগ পেলে ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি দেশের মাটিতে খেলতে। সরকার বলছে, তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলবে এবং ক্রিকেটে ফেরার কোনো বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে না। ফলে একজন ক্রিকেটারের প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি এখন কেবল ক্রীড়া প্রশাসনের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএমএম সালেহও বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন পরিচয় বা মর্যাদা নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। সরকারের দৃষ্টিতে সাকিব একজন আসামি এবং তাঁকে বাংলাদেশের আদালতে আত্মসমর্পণ করে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। অর্থাৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে সাকিব যে শর্তের কথা বলেছেন, সেটি থাকলেও আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ সরকারের বক্তব্যে নেই।
সাকিবের বর্তমান অবস্থান বুঝতে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মাগুরা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে তিনি দেশে ফেরেননি। এরপর বিদেশে অবস্থান করেই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে অংশ নিচ্ছেন।
শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও সাকিবের অবস্থান স্পষ্ট। রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে অনুসরণ করেছেন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও সেই অবস্থান থেকে সরে আসবেন না। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন—এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গেও সাকিব জানিয়েছেন, তিনি নিজে আগে ফিরতে না পারলে তাঁদের সঙ্গে ফেরার চেষ্টা করতে পারেন।
এই অবস্থানের কারণে সাকিবের দেশে ফেরা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে তিনি আইনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতির কথা বলছেন, অন্যদিকে সরকার তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে বিবেচনায় নিয়ে ক্রিকেটে ফেরার পথ বন্ধ বলে জানাচ্ছে। ফলে দেশে ফেরা এবং জাতীয় দলের হয়ে খেলা—দুটি বিষয় এখন আলাদা বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড অবশ্য চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাকিবের আবার ক্রিকেটে ফেরার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে তাঁর অংশগ্রহণের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে বলে সরকারি বক্তব্যে প্রতীয়মান হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাকিবের অবস্থানও তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে। তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ক্রিকেটারদের একজন। চার শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং পাঁচটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি অবসরের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। পরে অবশ্য একটি পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলে বিদায় নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
সাকিব এখনো মনে করেন, বয়স তাঁর বিপক্ষে যাচ্ছে বলে সময় বেশি নেই। তাই দেশে ফিরে বিদায়ী সিরিজ খেলার আকাঙ্ক্ষা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের আগে তাঁকে মোকাবিলা করতে হবে মামলার আইনি প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সরকারের কঠোর অবস্থান।
সবশেষে পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সাকিব দেশে ফিরতে অনিচ্ছুক নন; বরং নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে ফিরতে প্রস্তুত বলে প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। কিন্তু সরকার তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও শেখ হাসিনার সঙ্গে সাম্প্রতিক উপস্থিতির পর বাংলাদেশ দলে ফেরার সম্ভাবনা নাকচ করেছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, তাঁকে অন্য কোনো বিশেষ মর্যাদা নয়, একজন আসামি হিসেবে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।
তাই সাকিবের সামনে এখন প্রশ্ন শুধু ‘দেশে ফিরবেন কি না’—এমন নয়। বরং দেশে ফিরলে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, কীভাবে আইনি প্রক্রিয়া এগোবে এবং সেই প্রক্রিয়ার বাইরে তাঁর ক্রিকেটীয় বিদায়ের কোনো সুযোগ থাকবে কি না—এই তিন প্রশ্নই তাঁর প্রত্যাবর্তনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।




