মূল খবরে যান

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

সত্যের সাথে আগামীর পথে

শিরোনাম
চলচ্চিত্রে এসে কি আমরা পাপ করেছি?’ সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুব্ধ ওমর সানীএলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট প্রত্যাহার না হলে আইনি ব্যবস্থা: জ্বালানিমন্ত্রীপ্রকাশ্যে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র নেতাদের পাশে দাঁড়ালেন রাহুল গান্ধীছেলের ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল মায়ের, বাবা গুরুতর আহতকান্নারত শিশুকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা: সচিবালয় মেট্রো স্টেশন থেকে অপহরণকারী আটকসিরিজ হারলেও শেষ ম্যাচে পাকিস্তানকে উড়িয়ে শ্রীলংকার দাপুটে জয়লোকসভা নির্বাচনেও কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয় হবে: অমিত শাহ১৯ অক্টোবর দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা বাজুসের
খেলা

মিরাজের সেঞ্চুরির পরও ইনিংসে হার বাংলাদেশের

মিরাজের সেঞ্চুরির পরও ইনিংসে হার বাংলাদেশের

ক্রীড়া প্রতিবেদক:

এক পাশে মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাটে দুর্দান্ত শতরানের ঝলক, অন্য পাশে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে ভয়াবহ ধস—অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতি ম্যাচে এমন বৈপরীত্যের গল্প লিখল বাংলাদেশ। ডারউইনের ডিএক্সসি অ্যারেনায় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে তিন দিনের ম্যাচে মিরাজের অপরাজিত ১০৯ রানের পরও বাংলাদেশ হেরেছে ইনিংস ও ৩৮ রানে। প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রান করা বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে গুটিয়ে যায় মাত্র ৫৪ রানে।

৬ থেকে ৮ আগস্ট ডারউইনে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আসন্ন দুই টেস্টের আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতির অংশ। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, সফরের প্রথম টেস্ট ১৩ আগস্ট ডারউইনে এবং দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট ২২ আগস্ট ম্যাকেতে শুরু হওয়ার কথা।

ম্যাচের শুরুতেই বাংলাদেশের ব্যাটিংকে টেনে তুলেছিলেন মিরাজ। দলের ওপরের সারির ব্যাটাররা প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়তে না পারলেও তিনি একপ্রান্ত আগলে রাখেন। পরিস্থিতি সামলে ধৈর্য ও আক্রমণাত্মক শটের সমন্বয়ে এগিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ১০৯ রানে অপরাজিত থাকেন। তাঁর শতরানের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রান সংগ্রহ করে।

মিরাজের সেঞ্চুরিটি ছিল এই ম্যাচের বাংলাদেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল ব্যক্তিগত অর্জন। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে টেস্ট সিরিজের আগে এমন একটি ইনিংস তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডারউইনের পিচে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দীর্ঘ সময় ব্যাট করে শতরান করা বাংলাদেশের সহ-অধিনায়কের ব্যাটিং সক্ষমতারই প্রমাণ দিয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সেই ইতিবাচক শুরু শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফল বদলাতে পারেনি। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২৬৩ রানে অলআউট হওয়ার পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ ব্যাট হাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়। দুইবারের শেফিল্ড শিল্ডজয়ী টিগ উইলি দুর্দান্ত ১৩০ রান করেন। জেক ডোরানের সঙ্গে তাঁর ১৩৯ রানের জুটি স্বাগতিক দলকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়।

উইলির ১৩০ রান ছিল ১৭৭ বলে। ডোরান করেন ৭৬ রান। তাঁদের জুটিই বাংলাদেশের বোলারদের ওপর বড় চাপ তৈরি করে। বাংলাদেশের হয়ে মিরাজ নিজেও বল হাতে ডোরানকে ৭৬ রানে ফেরান। কিন্তু ততক্ষণে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ ম্যাচে সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে।

শেষ পর্যন্ত ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের প্রথম ইনিংস থামে ৩৫৫ রানে। বাংলাদেশের ২৬৩ রানের জবাবে তারা ৯২ রানের লিড নেয়। এরপর ম্যাচের শেষ দিনে বাংলাদেশের সামনে ছিল ইনিংস পরাজয় এড়ানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাটাররা পুরোপুরি ব্যর্থ হন।

দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং যেন হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ে। একের পর এক উইকেট হারিয়ে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয় দল। বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারই উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ৩০১ রানের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার আগেই ইনিংস শেষ হয়ে যায় এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ ইনিংস ও ৩৮ রানের জয় পায়।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস ধসের মূল কারিগর ছিলেন ক্যাম্পবেল থম্পসন। মাত্র ১১ ওভারে ২৫ রান দিয়ে ৮ উইকেট নিয়ে তিনি বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে কার্যত একাই গুঁড়িয়ে দেন। তাঁর ক্যারিয়ারে এটি ছিল সেরা বোলিং পারফরম্যান্স। অফস্পিনার কোরি রোচ্চিওলিও দুই উইকেট নেন; প্রথম ইনিংসেও তিনি ছয় উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটারদের বড় পরীক্ষায় ফেলেছিলেন।

প্রস্তুতি ম্যাচ হলেও বাংলাদেশের এই পরাজয় তাই স্বস্তির নয়। বিশেষ করে টেস্ট সিরিজের মাত্র কয়েক দিন আগে দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হওয়া ব্যাটিং বিভাগের জন্য বড় সতর্কবার্তা। অস্ট্রেলিয়ার মূল টেস্ট দলের পেস আক্রমণ আরও শক্তিশালী হওয়ায় ডারউইনের কন্ডিশনে বাংলাদেশের ব্যাটারদের সামনে যে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে, এই ম্যাচ সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।

তবে প্রস্তুতি ম্যাচের ফল দিয়ে পুরো টেস্ট সিরিজের সম্ভাব্য ফল নির্ধারণ করা যায় না। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের দলটি মূল জাতীয় দলের দল নয়; এতে ঘরোয়া ক্রিকেটের একাধিক তরুণ ও উদীয়মান ক্রিকেটার ছিলেন। থম্পসন মাত্র এক মৌসুম আগে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেছেন। ফলে তাঁর বিধ্বংসী বোলিং বাংলাদেশের জন্য যেমন উদ্বেগের, তেমনি এটিও মনে রাখতে হবে যে সামনে অপেক্ষা করছে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানের প্রতিপক্ষ।

তারপরও বাংলাদেশের জন্য ম্যাচটির শিক্ষা স্পষ্ট। প্রথম ইনিংসে মিরাজের ১০৯ রানের মতো ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স দলের জন্য ইতিবাচক দিক তৈরি করেছে। কিন্তু একজন ব্যাটারের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ টেস্ট ইনিংস দাঁড় করানো যায় না। টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারকে নতুন বলের চ্যালেঞ্জ সামলে দীর্ঘ সময় ক্রিজে থাকার সক্ষমতা দেখাতে হবে।

মিরাজের জন্য অবশ্য ম্যাচটি ব্যক্তিগতভাবে মিশ্র অভিজ্ঞতার। ব্যাট হাতে তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে সফল ব্যাটার; কিন্তু দলকে ইনিংস পরাজয় থেকে বাঁচাতে পারেননি। প্রথম ইনিংসে তাঁর শতরান বাংলাদেশের স্কোরকে প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নিয়ে গেলেও দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যর্থতা সেই অর্জনের প্রভাব অনেকটাই ম্লান করে দেয়।

অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি আরও বড় কারণ দলটি খুব কম সময়ের মধ্যে স্থানীয় কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের ঘোষিত টেস্ট দলে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, সহ-অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ, মুশফিকুর রহিম, মুমিনুল হক, তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদসহ অভিজ্ঞ ও তরুণদের সমন্বয় রয়েছে।

সফরের প্রথম টেস্ট শুরু হবে ১৩ আগস্ট ডারউইনের মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে। দ্বিতীয় টেস্ট ২২ আগস্ট ম্যাকেতে। দুই ম্যাচের এই সিরিজ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলমান চক্রের অংশ। ফলে প্রস্তুতি ম্যাচের পরাজয় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পয়েন্টের হিসাব বদলাবে না, কিন্তু টেস্টের আগে দলের প্রস্তুতির দুর্বলতা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ম্যাচটির গুরুত্ব যথেষ্ট।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে প্রস্তুতি ম্যাচের ভুল থেকে দ্রুত শিক্ষা নেওয়া। মিরাজের সেঞ্চুরি দেখিয়েছে ব্যাটিংয়ের জন্য কন্ডিশন পুরোপুরি অচেনা নয়; আর ৫৪ রানের ইনিংস দেখিয়েছে মানসিক দৃঢ়তা ও টেকনিকের জায়গায় আরও কাজ প্রয়োজন। জাতীয় দলের সামনে এখন প্রস্তুতির শেষ সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে টেস্ট সিরিজে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ।

অতএব ডারউইনের এই প্রস্তুতি ম্যাচের ফল বাংলাদেশের জন্য একদিকে হতাশার, অন্যদিকে সতর্কবার্তার। মিরাজের ব্যাটে শতরানের আলো জ্বললেও দলের ব্যাটিংয়ের বড় অংশ অন্ধকারেই রয়ে গেছে। ১৩ আগস্ট যখন অস্ট্রেলিয়ার মূল দলের বিপক্ষে টেস্ট লড়াই শুরু হবে, তখন এই ম্যাচে পাওয়া শিক্ষা কাজে লাগাতে পারাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

খেলা
খবরটি শেয়ার করুন কপি হয়েছে